উত্তর-দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদী পানিশূন্য

শুষ্ক মওসুমে ফারাক্কা ও গজলডোবা ব্যারাজের মাধ্যমে পদ্মা ও তিস্তার পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে ভারত। এর বিরূপ প্রভাবে ভাটির বাংলাদেশ অংশে পদ্মা ও তিস্তা মরা নদীতে পরিণত হয়েছে। জেগে উঠেছে অসংখ্য ছোট-বড় চর। সেই সাথে নদী দু’টির প্রধান প্রধান শাখাসহ বহু প্রশাখা ও উপনদী হয়ে পড়েছে প্রায় পানিশূন্য। ফলে দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর তিন থেকে পাঁচ মিটার নিচে নেমে গেছে। নলকূপে পর্যাপ্ত পানি উঠছে না। একই সাথে বেড়েছে আর্সেনিকের মাত্রা। এ অঞ্চলের কৃষি, মৎস্য ও ব্যবসাবাণিজ্যে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। ভারতীয় পানিসম্পদ বিভাগের এক ওয়েবসাইট সূত্রে জানা যায়, তিস্তা নদী ঘিরে পাঁচটি সেচখাল বা ক্যানেল প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে ভারত। এগুলো হলো, তিস্তা-মহানন্দা মূল ক্যানেল, মহানন্দা প্রধান ক্যানেল, ডাউক নগর প্রধান ক্যানেল, নাগর টাঙ্গন প্রধান ক্যানেল ও তিস্তা-জলঢাকা প্রধান ক্যানেল। ভারত গজলডোবায় তিস্তার ওপর যে ব্যারেজ নির্মাণ করেছে এর ফলে শুকনো মওসুমে ভারতীয় অংশে নদীটি পানিতে টইটম্বুর থাকে। অন্য দিকে তিস্তার বাংলাদেশ অংশ ধূ-ধূ বালুচরে পরিণত হয়। এতে কমেছে মাছ ও জলজপ্রাণী। বেড়েছে তাপমাত্রা। আবহাওয়ায় বিরাজ করছে রুক্ষতা। গজলডোবায় ভারত ব্যারেজ নির্মাণ করায় বাংলাদেশ অংশে তিস্তায় পানি প্রবাহ অস্বাভাবিক কমে যাওয়ায় করতোয়া, চাওয়াই, পাঙ্গা, তীরনই, বেরং, রণচণ্ডি, জোড়াপানি, পাথরাজ, সিঙ্গিয়া, ধরলা, দুধকুমার, সানিয়াজান, ঘাঘট, ছোটযমুনা, নীলকুমার, বাঙ্গালী, বড়াই, মানস, কুমলাই, সোনাভরা, হলহলিয়া, জিঞ্জিরাম, বুড়িতিস্তা, যমুনেশ্বরী, মহানন্দা, টাঙ্গান, কুমারী, রতœাই, পুনর্ভবা, ত্রিমোহনী, তালমা, ঢেপা, কুরুম, কুলফি, বালাম, ভেরসা, ঘোড়ামারা, চারালকাঁটা, পিছলাসহ বহু শাখা-প্রশাখা ও উপনদী শুকিয়ে গেছে। একই সাথে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর তিন থেকে পাঁচ মিটার পর্যন্ত নিচে নেমে গেছে। নলকূপে পর্যাপ্ত পানি উঠছে না। অন্য দিকে তিস্তায় পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ায় দেশের সর্ববৃহৎ তিস্তাসেচ প্রকল্প স্থবির হয়ে পড়েছে।
তিস্তাসেচ প্রকল্প এলাকায় সাত লাখ হেক্টর জমিতে প্রতি বছর বোরো মওসুমে পানির তীব্র সঙ্কট দেখা দিচ্ছে। এ দিকে তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের মিলিত প্রবাহের যমুনা নদী নাব্যতা হারাচ্ছে। নদীর মূলধারা সঙ্কীর্ণ হয়ে পড়েছে। যমুনা সংযুক্ত ২০টি নদী প্রায় পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ফারাক্কা ব্যারাজের ভাটিতে মুর্শিদাবাদের জঙ্গীপুরে একটি ব্যারেজ তৈরি করেছে ভারত। এর সাথে যুক্ত আছে ৩৮ দশমিক ৩ কিলোমিটার ফিডার ক্যানেল। ফারাক্কা বাঁধ থেকে গঙ্গার পানি এ ক্যানেল পথেই ভাগীরথীতে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। ফারাক্কা বাঁধ প্রকল্পের মাধ্যমে ভাগীরথী-হুগলি নদীর প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে ফিডার ক্যানেলে দৈনিক ৪০ হাজার কিউসেক পানি ছাড়া হয়। ভারত ফারাক্কার উজানে উত্তর প্রদেশ রাজ্য ও কানপুর ব্যারাজ এবং উত্তর প্রদেশ ও বিহারে সেচের জন্য আরো প্রায় ৪০০ পয়েন্ট দিয়ে পানি সরিয়ে নিচ্ছে। এর বিরূপ প্রভাবে পদ্মা শুকিয়ে মরা নদীতে পরিণত হয়েছে। পদ্মাসংযুক্ত প্রধান প্রধান শাখা-প্রশাখা ও উপনদীগুলো শুকিয়ে গেছে। ফলে এ অঞ্চলের কৃষি, সেচব্যবস্থা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। পদ্মার পানি দিয়ে শুকনো মওসুমে রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোর, ফরিদপুর প্রভৃতি জেলায় সেচকাজ চালানো হয়। এ নদীর পানি দিয়ে প্রায় ২০ ভাগ জমির সেচকাজ চলে। বাংলাদেশের কৃষি, শিল্প, ব্যবসাবাণিজ্য, নৌযোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পদ্মা নদীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পদ্মার প্রধান শাখা নদী মাথাভাঙ্গা, কুমার, ইছামতি, গড়াই, আড়িয়ালখাঁ প্রভৃতি। প্রশাখা মধুমতি, পশুর ও কপোতাক্ষ। উপনদী মহানন্দা। মহানন্দা রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে পদ্মায় মিলিত হয়েছে। পদ্মা প্রধান প্রধান শাখা প্রশাখা ও উপনদী শুকিয়ে যাওয়ায় ব্যবসাবাণিজ্য ও কৃষিখাত ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। পদ্মা-তিস্তাসহ এর প্রধান প্রধান শাখা, অসংখ্য প্রশাখা ও উপনদী প্রায় পানিশূন্য। অনেকে হেঁটেই পাড়ি দিচ্ছেন নদী। পদ্মা ও তিস্তাপাড়ে এখন আর গাঙচিল বেলেহাঁস আর ধবল বক দেখা যায় না। দৃষ্টিতে আসে না অন্যান্য পাখি। নদী দু’টিতে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় এগুলো প্রায় মাছশূন্য হয়ে পড়েছে। এক সময় পদ্মা-তিস্তা ও এর প্রধান শাখা-প্রশাখা, উপনদীগুলোর সাথে জেলে পরিবারগুলোর জীবন-জীবিকা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল। তাদের প্রায় সবাই আজ কর্মহীন। অনেকেই পেশা ছেড়ে অন্য কাজ করছেন। এছাড়া মাঝি-মাল্লারা কর্মহীন হয়ে বেকার জীবনযাপন করছেন। খেয়াঘাটের মাঝি জব্বার শেখ বলেন, ‘পানি নাই নৌকা চলবো ক্যামনে, তাই হগোলেই হাঁইটা নদী পাড় হইতাছে।’ গড়াইপাড়ের জেলে অমলকান্তি হালদার জানান, পদ্মায় পানি নাই। মাছও নাই। বেঁচে থাকার তাগিদে পেশা পরিবর্তন করে চাতালে দিনমজুরের কাজ করছি। কুষ্টিয়ার কয়ায় পদ্মার প্রধান শাখা নদী গড়াইয়ের ওপর নির্মিত গড়াই রেল ও রুমী ব্রিজের নিচে ধূ ধূ বালুচর। জিকে প্রজেক্ট কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। মধুমতি, নবগঙ্গা, কাজলা, মাথাভাঙ্গা, গড়াই, আত্রাই, চিকনাই, হিনসা, কুমার, সাগরখালি, কপোতাক্ষ, চন্দনাসহ পদ্মার অসংখ্য শাখা-প্রশাখায় জেগে উঠেছে ছোট-বড় অসংখ্য চর। কোনো কোনো স্থানে বালু স্থায়ী মৃত্তিকায় রূপ নেয়ায় ফসল আবাদ করেছেন কৃষক। বর্তমানে পদ্মার হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও লালন শাহ ব্রিজের নিচে খাস জমিতে চীনাবাদাম, বাঙ্গি, তরমুজ, টমেটো, আখসহ রবি শস্য আবাদ হচ্ছে। পদ্মার আর একটি শাখা নদী মরাপদ্মা, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে মূলপদ্মা, গড়াই ও পাবনার চাটমোহরের বড়াল, ছোট যমুনা, পুনর্ভবা, আত্রাই, ইছামতি, গুমানী, গোমতী, ভদ্রবতী, গোহালা, নন্দকুজা, গাড়াদহ, কাঁকন, কাকেশ্বরী, সরস্বতী, মুক্তাহার ঝবঝবিয়া, ফুলজোর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, এসব নদীর অস্তিত্ব হারিয়ে যাচ্ছে।
পদ্মায় পানির প্রবল টান পড়ায় এসব নদী শুকিয়ে গেছে। কোনো কোনো স্থানে হাঁটুপানি। এলাকার প্রবীণদের মতে, ফারাক্কা ব্যারাজের আগে এসব নদ-নদীতে সারা বছর পানি থাকত। অন্য দিকে তিস্তায় পানি না থাকায় ব্রহ্মপুত্র নদে পানির টান পড়ায় যমুনা শুকিয়ে যাচ্ছে। যমুনায় অসংখ্য চর জেগে উঠেছে। নাব্যতা কমে যাওয়ায় জ্বালানি তেল, রাসায়নিক সারসহ অন্যান্য পণ্যবাহী জাহাজ আন্ডারলোড নিয়ে বাঘাবাড়ী বন্দরে আসছে। ফারাক্কার কারণে যশোর-খুলনা অঞ্চলে মিঠাপানির প্রবাহ কমে গেছে। ফারাক্কার কারণে পদ্মার তলদেশ ওপরে উঠে এসেছে। শুষ্কো মওসুমে এখন পদ্মায় তেমন ইলিশ পাওয়া যায় না। মাছ আসতে যে পরিমাণ প্রবাহ থাকার কথা তা না থাকায় এখন পদ্মায় ইলিশ আসে না। গাঙ্গেয় পানিব্যবস্থায় দুই শতাধিক জাতের মিঠাপানির মাছ ও ১৮ প্রজাতির চিংড়ি ছিল। সেগুলোর অধিকাংশই এখন বিলুপ্তির পথে। পদ্মায় পানি স্বল্পতায় উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে মরুকরণ স্থায়ী রূপ নিচ্ছে। জীববৈচিত্র্য অনেক আগেই হুমকিতে পড়েছে। ফারাক্কার উজানে উত্তর প্রদেশ ও বিহারে সেচের জন্য আরো প্রায় ৪০০ পয়েন্ট দিয়ে পানি সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ভারত। শুকনো মওসুমে এসব পয়েন্ট থেকে হাজার হাজার কিউসেক পানি প্রত্যাহার করা হয়। এর প্রভাবে ফারাক্কা পয়েন্টে পানির প্রবাহ ব্যাপকভাবে কমে যায়। পদ্মাসংযুক্ত বরেন্দ্র অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত মহানন্দা, নন্দকুজা, মুসাখাঁ, ভদ্রাবতী, সরস্বতী, ইছামতি, গুমানী, আত্রাই, ফুলঝোর, তুলসী, চেঁচুয়া, ভাদাই, চিকনাই, বানগঙ্গা, গোহালা নদী আত্রাই, বারনই, শিব, রানী ও ছোট যমুনা নদী, ২২টি খাড়ি ও ৩৯টি বিলে এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। যশোর-কুষ্টিয়ার নদীগুলো পদ্মার সাথে সংযোগ হারিয়ে ফেলেছে। পাবনার ইছামতি, রতœাই, চন্দ্রাবতী এবং রাজশাহীর কয়েকটি নদী রয়েছে। পদ্মার প্রধান শাখা নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে গড়াই, মধুমতী, আড়িয়ালখাঁ, ভৈরব, মাথা ভাঙ্গা, কুমার, কপোতাক্ষ, পশুর ও বড়াল। এসব নদী-খাল পলি ও বালু জমে ভরাট হয়ে শুকিয়ে গেছে। ফলে এ অঞ্চলের কৃষির সেচব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, প্রকৃতিগত দিক দিয়ে নদী বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বুনিয়াদ। পেশাগত দিক থেকে জীবন-জীবিকার একটি অংশ নির্ভরশীল এ দেশের নদ-নদীর ওপর। এ দেশের কৃষি সম্পদ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, ব্যবসাবাণিজ্য, পরিবেশ- এর সবই নদীনির্ভর। ভারত অভিন্ন নদ-নদীর পানি একতরফা নিয়ন্ত্রণ করছে। এর বিরূপ প্রভাবে কয়েক দশকে দেশের উত্তর-দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, শিল্প ও ব্যবসাবাণিজ্যে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে যা এ অঞ্চলের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
Share on Google Plus

About Sadia Afroja

    Blogger Comment
    Facebook Comment

0 comments:

Post a Comment