কক্সবাজার সদর সাব রেজিষ্ট্রি অফিসে লাগামহীন দূর্নীতি


বিশেষ প্রতিবেদকঃ
বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন সদর সাব রেজিষ্ট্রার মাজেদা বেগম। তার যোগদানের পর থেকে রকমারী অনিয়ম দূর্নীতির আখড়ায় পরিনত হয়েছে কক্সবাজার সদর সাব রেজিষ্ট্রার অফিস। সরকারী অত্র অফিসে বিভিন্ন কৌশলে চলছে সেবাপ্রার্থী জনগনের পকেট কাটা ও লুটপাট। কথিত "টিপস" নামের ঘুষ আদায় করা হচ্ছে দশ পারসেন্ট থেকে ১৫ পারসেন্ট পর্যন্ত। তার উপর ডিআরও (জেলা রেজিষ্ট্রেশন কর্মকর্তা) এর নামে আদায় করা হয় দলিল প্রতি অন্ততঃ পাঁচ-দশ হাজার টাকা। এসব ছাড়াও আরো বিভিন্ন  অনিয়মের পিছনে ইন্ধন দিচ্ছেন সদর সাব রেজিষ্ট্রার মাজেদা বেগম।  আর এতে তাকে সহায়তা করছেন মোহরার মন্টু বড়ুয়া ও সজীবেরর নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট। এমনটাই উঠে এসেছে দীর্ঘ অনুসন্ধানে।
ভূক্তভোগীরা জানান, গত জুন মাসে সদর সাব রেজিষ্ট্রার হিসাবে মাজেদা বেগম যোগ দেয়ার পর থেকেই অনিয়ম-দূর্নীতির আখড়ায় পরিনত করেছেন অত্র অফিসকে। তার যোগদানের পর থেকে কৌশলে  আদায় হচ্ছে বিভিন্ন প্রকার ঘুষ। সূত্রে প্রকাশ, ইতিপূর্বে একই ধরনের অনিয়ম ও দূর্নীতির বদনামের দায়ভার ও মামলার আসামী হয়ে চকরিয়া উপজেলা সাব রেজিষ্ট্রার শাহ নেওয়াজ খান ২০১৪ স্ট্যান্ড রিলিজ হন। কিন্তু মাজেদা বেগমের বিরুদ্ধে এখনো ব্যবস্হা নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় সুত্র জানায়, সদর সাব রেজিষ্ট্রি অফিসে লুটপাটে জড়িত রয়েছেন অসৎ নকল নবীশ, মোহরার, কেরানী ও কর্মচারীগন। মাজেদা বেগমের নির্দেশনায় লুটপাট ইঞ্জিনিয়ারিং এ দক্ষ নকল নবীশ, কেরানী ও অসৎ দলীল লেখকগন নতুন নতুন কৌশল নিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। ফলে কক্সবাজার সদর সাব রেজিস্ট্রার অফিসে দূর্নীতিবাজ চক্র চালাচ্ছে অনিয়ম দুর্নীতির মহোৎসব।
সূত্রে জানা গেছে, অত্র অফিসে প্রতিদিন অনেক  দলিল রেজিষ্ট্রি সম্পাদন হয়। এ ক্ষেত্রে অফিসের সংশ্লিষ্টরা ৫ পারসেন্ট টিপস(ঘুষ), ডিআরও’র চাঁদা, দাখিলা-খতিয়ান অনয়ন ফি সহ প্রতিমাসে শত শত দলিল রেজিষ্ট্রি খাতে (দলিল প্রতি) সর্বনিন্ম ৫ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৫০হাজার টাকা পযর্ন্ত উৎকোচ আদায় করে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়াও প্রতি দলিলে টিপসহি নিতে পিয়ন মানিক এক হাজার টাকা আদায় করে।
সূত্র জানায়, সাব রেজিষ্ট্রারের যোগসাজসে অফিসের প্রধান সহ দুই অফিস সহকারী সজীব ও মন্টু, দুই পিসি মোহরার (ফিস কালেকশন) ও একজন এমএলএস জমি ক্রেতার (দলিল গ্রহীতার) কাছ থেকে যাবতীয় উৎকোচের টাকা আদায় করেন। তাদেরকে এসব কাজে নানাভাবে সহযোগিতা দেন মাষ্টার রোলে কর্মরত অফিসের নকল নবিশরা। এদের মধ্যে নকল নবিশ পদে কর্মরত স্থানীয় বেশ ক’জন নকল নবীশকে মাস্তান হিসেবে ব্যবহার করে সাব রেজিষ্ট্রার ও অপরাপর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এদের দাবীকৃত টাকা না দিলে মোহরার সজীব কান্তি ও মন্টু বড়ুয়ার নেতৃত্বে বিভিন্ন অজুহাতে হয়রানি করে গ্রাহকদের।
জানা যায়, যোগাযোগ ব্যবস্থার আমুল পরিবর্তনের কারণে প্রত্যন্ত এলাকায় প্রতিবছর বেড়ে চলছে জমি বেচা-কেনা। প্রতিযোগিতা মূলক জমি বেচা-কেনার কারণে বর্তমানে প্রায় প্রত্যেক মৌজায় জমির মূল্য বেড়েছে আকাশচুম্বি। এ সুযোগে সদর সাব রেজিষ্ট্রার অফিসের দূর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দলিল লিখকদের মাধ্যমে জমি বিক্রয় মূল্যের বিপরীতে ব্যাংক চালান জমা দেয়ার পর রেজিষ্ট্রি সম্পাদন করার ক্ষেত্রে অফিস খরচের নামে ক্রেতাদের কাছ থেকে প্রতি মাসে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সদর উপজেলা সাব রেজিষ্ট্রার ও তার অফিসের কর্মচারীরা জমি রেজিষ্ট্রি করার ক্ষেত্রে পৌরসভার একটি ১০লাখ টাকার দলিল থেকে ৫ হাজার টাকা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে একই অংকের একটি দলিলের বিপরীতে জমি রেজিষ্ট্রির দলিল সম্পাদনে উৎকোচ নিচ্ছে ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা করে। এ ছাড়াও জমি ক্রেতা-বিক্রেতার সাথে যোগসাজসে প্রকৃত মুল্য থেকে কম মূল্য দেখিয়ে অবৈধভাবে উৎকোচ গ্রহনের মাধ্যমে দলিল রেজিষ্ট্রি সম্পাদন করেন । এক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয় সরকার । একই সাথে অফিসের সংশ্লিষ্টরা সরকারী নিয়মে ৭ দিনের মধ্যে নকল দেয়ার ক্ষেত্রে ২৫২টাকা সরকারী ফি: পরিবর্তে জমি ক্রেতার কাছ থেকে আদায় করছে প্রকার ভেদে ১১শত থেকে ২হাজার টাকা পযর্ন্ত। আর এরজন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় সংশ্লিষ্ট জমি ক্রেতাকে।
সূত্র জানায়, জমি রেজিষ্ট্রি করার সময় অফিসের সংশ্লিষ্টরা ডি.আর ফান্ড (জেলা রেজিষ্ট্রারের নামে চাঁদা) বাবৎ দলিল প্রতি নির্ধারিত টাকা ও আইজিআর নিবন্ধন খাতে আরো ১শত টাকা করে জমি ক্রেতার কাছ থেকে আদায় করে থাকেন। পে-অর্ডার (ব্যাংক ড্রাফট) ভাঙ্গতে নেন দলিল প্রতি  ১০০০ টাকা করে। যদিও ওই টাকা নেয়ার সরকারী কোন নির্দেশনা নেই এ অফিসে। তবে চালু রয়েছে, এ অফিসে খতিয়ানের সহিমুহুরী দেখাতে ৫শত টাকা, খাজনা দাখিলা নিতে দিতে হয় সংশ্লিষ্ট ভূক্তভোগীকে ৫ শত থেকে ১হাজার টাকা করে।
গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, অফিসের দূর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জমি রেজিষ্ট্রি করার ক্ষেত্রে ক্রেতা-বিক্রেতার ছবি, জন্মনিবন্ধন ও ভোটার আইডি না থাকলেও মুহুর্তেই এসব করে দেন তারা। এ অনিয়মের জন্য সাব রেজিষ্ট্রারকে সংশ্লিষ্টদের দিতে হয় ৫ হাজার টাকা করে। আর অলিখিত এই জালিয়াতির সুযোগ দিয়ে অফিসের সংশ্লিষ্টরা হাতিয়ে নেন একটি নির্ধারিত অংকের উৎকোচ। এছাড়াও প্রবাসী ক্রেতার নামে জমি রেজিষ্ট্রারী করার সুযোগ দিয়ে সংশ্লিষ্টরা আদায় করেন মোটা অঙ্কের উৎকোচ। এভাবে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রতিমাসে জমি রেজিষ্ট্রি দলিল সম্পাদনসহ নানা খাতে প্রায় লাখ লাখ টাকা উৎকোচ হাতিয়ে নিচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবী করেছে, প্রতিমাসে জমি রেজিষ্ট্রিসহ নানাখাত থেকে আদায় করা উৎকোচের অর্ধেক নেন সাব রেজিষ্ট্রার। অবশিষ্ট টাকা ভাগ ভাটোয়ারা করেন অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী,রাজনৈতিক লুটেরা ও মাষ্টার রোলে কর্মরত নকল নবিশরা। তবে দুর্নীতির টাকার একটি অংশ প্রতিমাসে পৌছে দেয়া হয় জেলা রেজিষ্ট্রারসহ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন দপ্তরে। এদের মধ্যে নকল নবিশ পদে কর্মরত স্থানীয় বেশ ক’জন নকল নবীশকে মাস্তান হিসেবে ব্যবহার করে সাব রেজিষ্ট্রার, অফিস সহকারী সজীব ও মন্টুসহ ও অপরাপর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এ অনিয়মে সহযোগীতা করতে অনিহা প্রকাশ করলেও দলিল আটকিয়ে দেবার ভয়ে নিরব থাকেন অধিকাংশ দলীল লেখক। রকমারী এসব অনিয়মের মূল হোতা সাব রেজিষ্ট্রার মাজেদা বেগমের আরো সব দূর্নীতির  ব্যাপারে বিভাগীয়ভাবে তদন্তের দাবী প্রয়োজন মনে করছেন ভূক্তভূগীরা। উপরোক্ত ব্যাপারে জানতে চাইলে সদর সাব রেজিষ্ট্রার মাজেদা বেগম "এখানে  কোন দূর্ণীতি হচ্ছেনা" বলে ফোন বন্ধ করে দেন । ভূক্তভোগীরা জানান, দূর্ণীতিবাজ সাব রেজিষ্ট্রার মাজেদা বেগমের বিরূদ্ধে দূর্ণীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দায়ের করা হবে।
Share on Google Plus

About Iqbal Bahar

    Blogger Comment
    Facebook Comment

0 comments:

Post a Comment