আমার কষ্ট হচ্ছে এই বিচারাঙ্গন থেকে বিদায় নিতে

দীর্ঘ বিচারিক জীবনের ইতি টানলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী  বিচারক আপিল বিভাগের বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা। আজ (৭ই জুলাই) তার বয়স ৬৭ বছর পূর্ণ হলো। বাংলাদেশের সংবিধানের  ৯৬ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরা ৬৭ বছর বয়স পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে পারেন। সে হিসাবে আজই শেষ হলো বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানার কর্মজীবন। তবে, আজ সরকারি ছুটির দিন হওয়ায় গতকালই (বৃহস্পতিবার) ছিল তার শেষ কর্মদিবস। গতকাল সকালে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ও অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের পক্ষ থেকে আপিল বিভাগের এক নম্বর এজলাস কক্ষে বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানাকে বিদায়ী সম্ভাষণ জানানো হয়।  গতকাল বিদায়ী বক্তব্যে এজলাসে উপস্থিত প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ অন্যান্য বিচারপতিগণ, আইনজীবী ও আদালত সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আজকের এই ক্ষণটিতে এই বিচার অঙ্গন থেকে বিদায় নিতে, আমার এই অতি আপনজনদের ছেড়ে যেতে কষ্ট হচ্ছে।
বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, প্রায় ৪২ বছরের বিচারকের জীবন আমার শেষ হলো আজ। বিচার করার কঠিন কাজ ও বিচারকের সীমাবদ্ধ জীবন থেকে মুক্ত হওয়ার আগ্রহ ছিল আমার। কিন্তু বিদায়ের এই দিনটি যতই এগিয়ে আসছিল ততই ঐ আগ্রহটি কমে আসছিল। আর আজকের এই ক্ষণটিতে আমার কষ্ট হচ্ছে এই বিচার অঙ্গন থেকে বিদায় নিতে, আপনাদের সবাইকে ছেড়ে যেতে। তিনি বলেন, সুদীর্ঘ সময় বিচারকাজে নিয়োজিত থাকায় এই বিচার অঙ্গনের সঙ্গে জড়িত সবাই আমার অতি আপনজন হয়ে গেছেন। আমার এই অতি আপনজনদের ছেড়ে যেতে আমার খুবই কষ্ট হচ্ছে। আইন পেশায় আসাসহ দেশের প্রথম নারী বিচারক হয়ে ওঠার কঠিন বিষয়টি বক্তব্যে তুলে ধরেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা। তিনি বলেন, দেশের প্রথম নারী বিচারক হয়ে আমি খুলনার জজশিপে মুন্সেফ হিসেবে ১৯৭৫ সালে যোগদান করি। ঐ সময়টায় একটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ খবর হিসেবে দেশের খবরের কাগজগুলোতে এটি ছাপা হয়েছিল। প্রতিক্রিয়া দু’রকমেরই হয়েছিল। কেউ কেউ স্বাগত জানিয়েছিলেন, আবার অনেকে নাক সিঁটকেছিলেন- ‘নারী আবার বিচারক হতে পারে না কি- নারী আবার কি বিচার করবে?’ কর্মক্ষেত্রেও আমি দু’রকমেরই আচরণ পেয়েছিলাম। অনেকের কাছ থেকে অবজ্ঞা পেলেও অনেকের কাছ থেকেই খুবই ভালো আচরণ পেয়েছি, উৎসাহ পেয়েছি, সাহায্য পেয়েছি। ওই উৎসাহ, সাহায্যটুকু না পেলে হয়তো বিচারক হিসেবে আমার টিকে থাকাই সম্ভব হতো না। প্রথম নারী বিচারক হিসেবে আমি ব্যর্থ হলে আজ হয়তো বাংলাদেশে প্রায় ৪শ’ নারী বিচারক হতো না। বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, জেলা জজ হিসেবে প্রশাসনিক কাজে আমার দক্ষতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট অনেকের মনে আবার প্রশ্ন ওঠে- যার বহিঃপ্রকাশ আমাকে নানাভাবেই স্পর্শ করে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই বোঝা গেল একজন নারী বিচারক অনেক পুরুষ বিচারকের চাইতে দক্ষ প্রশাসক। তিনি বলেন, প্রায় ৪২ বছরের বিচারক জীবনের প্রথমদিকে যখনই কোনো জজশিপে যোগ দিয়েছি- আমি বেশ বৈরী মনোভাব ও আচরণের সম্মুখীন হয়েছি। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তা দূর হয়ে গেছে। আমার উপর সংশ্লিষ্টদের বিপুল আস্থা আমি অর্জন করেছি। বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, আমি আমার সুদীর্ঘ বিচারক জীবনে কখনই জেনেবুঝে, অবহেলা করে বা অমনোযোগী হয়ে কোনো ভুল বিচার বা অন্যায় বিচার করিনি। আমি আমার সমস্ত জ্ঞান-বুদ্ধি, সবটুকু  মনোযোগ, সমগ্র একাগ্রতা দিয়ে বিচারকাজ করে গেছি। তিনি বলেন, পক্ষাশ্রিত হয়ে বা কোনো কারণে কারো দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়ে বিচার করা মহাপাপ। আমার আত্মতৃপ্তি- পক্ষাশ্রিত বা প্রভাবান্বিত হয়ে ভুল, অন্যায় বিচার কখনো করিনি।
১৯৫০ সালের ৮ই জুলাই মৌলভীবাজারে জন্মগ্রহণ করেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা। তার পিতা চৌধুরী আবুল কাশেম মইনুদ্দিন। মা বেগম রাশিদা সুলতানা। রাশিদা সুলতানা ছিলেন ময়মনসিংহের  রাধাসুন্দরী গার্লস হাইস্কুলের শিক্ষিকা। এ কারণে ময়মনসিংহেই কেটেছে নাজমুন আরার  শৈশব। নাজমুন আরা সুলতানা ১৯৬৫ সালে ময়মনসিংহ সদরের বিদ্যাময়ী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিকুলেশন, ১৯৬৭ সালে মুমিনুন্নেসা মহিলা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। পরে ১৯৬৯ সালে ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজ থেকে বিএসসি ডিগ্রি এবং ময়মনসিংহ ল’ কলেজ থেকে ১৯৭২ সালে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ওই বছরের জুলাইয়ে তিনি ময়মনসিংহ জেলা আদালতে  আইনজীবী হিসেবে আইন পেশায় নিযুক্ত হন। ১৯৭৪ সালে বিসিএস (বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৭৫ সালের শেষদিকে খুলনায় প্রথম নারী মুন্সেফ হিসেবে (সহকারী জজ) যোগদান করেন নাজমুন আরা সুলতানা। অতিরিক্ত জেলা জজ হিসেবে পদোন্নতির পর কিছু সময় তিনি আইন মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৯০ সালের ২০শে ডিসেম্বর জেলা জজ হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যোগদান করেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তিন বছর বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর ঢাকায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের লিগ্যাল অ্যাডভাইজার (আইনি উপদেষ্টা) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন নাজমুন আরা সুলতানা। এরপর ২০০০ সালের ২৮শে মে হাইকোর্ট বিভাগে অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। এর দুই বছর পর তিনি স্থায়ী নিয়োগ পান। ২০১১ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগের বিচারক হিসেবে শপথ নেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা।  বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা নারী বিচারকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ উইমেন জাজেস অ্যাসোসিয়েশন’র  (বিডব্লিউজেএ) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।  আন্তর্জাতিক নারী আইনজীবী সংস্থার দুইবার সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব  পালন করেন তিনি। নাজমুন আরা সুলতানার স্বামী কাজী নুরুল হক। তাদের দুই ছেলে। উচ্চ আদালতে বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা ফতোয়া বিষয়ক মামলা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সেনানিবাসের বাড়ির মামলা, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী, সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অপসারণ সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী মামলাসহ গুরুত্বপূর্ণ মামলায় বিচারিক দায়িত্ব পালন করেছেন।
Share on Google Plus

About বাংলা খবর

    Blogger Comment
    Facebook Comment

0 comments:

Post a Comment