ডিসিদের ২৩ নির্দেশনা দিলেন প্রধানমন্ত্রী

দেশের সব জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) ২৩টি নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জেলা প্রশাসকদের তিন দিনব্যাপী সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে এ নির্দেশনা দেন তিনি। বলেন, আপনাদের নিয়মিত বহুবিধ কাজের কিছু বিষয়ে আমি বিশেষভাবে কর্মতৎপর হতে আহ্বান জানাচ্ছি। ২৩ দফা নির্দেশনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সরকারি সেবা গ্রহণে সাধারণ মানুষ যাতে কোনোভাবেই হয়রানি বা বঞ্চনার শিকার না হয় সেদিকে লক্ষ রাখা, তৃণমূল পর্যায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে কাজ করা, গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করে নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা,  মানুষ যেন শহরমুখী না হয় সে ব্যবস্থা নেয়া। এ সময় প্রধানমন্ত্রী গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, সম্ভাবনাময় স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনে পদক্ষেপ নিতে ডিসিদের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ধনী-গরিবের মধ্যে বৈষম্য কমাতে উন্নয়ন কর্মসূচি এমনভাবে নিতে হবে যাতে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ উপকৃত হয়। বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িকতা দূর করে সমাজ জীবনের সবখানে শান্তিশৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আরও সতর্কতার সঙ্গে এবং কঠোরভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস নির্মূলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্কুল-কলেজ-মাদরাসার শিক্ষক, মসজিদের ইমাম, গ্রামের মুরুব্বি নেতৃস্থানীয় ব্যবসায়ী, নারী সংগঠক, আনসার-ভিডিপি, গ্রাম পুলিশ, এনজিও কর্মীসহ সমাজের সবাইকে সম্পৃক্ত করতে হবে। নির্দেশনায় আরও বলা হয়, প্রতিবন্ধী, অটিস্টিক ও পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর কল্যাণে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে। সাধারণ মানুষকে সহজে সুবিচার প্রদান ও আদালতে মামলার জট কমাতে গ্রাম আদালতগুলোকে কার্যকর করতে হবে। জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছাতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়ন ও বিকাশে নেতৃত্ব দিতে হবে, শিক্ষার সর্বস্তরে নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধি এবং ঝরেপড়া শিক্ষার্থীদের মূলধারায় ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ নিতে হবে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ভূমি প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সরকারি ভূমি রক্ষায় আরও সচেষ্ট হওয়া, কৃষি উৎপাদন বাড়াতে সার-বীজ-বিদ্যুৎ-জ্বালানি ইত্যাদির সরবরাহ নির্বিঘ্ন করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া, পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থাপনাকে জনপ্রিয় করতে উদ্যোগী হওয়া, ভেজাল খাদ্যদ্রব্য বাজারজাতকরণ প্রতিরোধে ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টি করে এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ড কঠোর হস্তে দমন করার পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী ডিসিদের উদ্দেশে বলেন, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও এসডিজির সফল বাস্তবায়নে মেধা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিপর্যয় রোধে প্রশাসনে সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে। পরিবেশ রক্ষার জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং এই সংক্রান্ত আইন ও বিধিবিধানের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। শিল্পাঞ্চলে শান্তি রক্ষা, পণ্য পরিবহন ও আমদানি-রপ্তানি নির্বিঘ্ন করা এবং পেশিশক্তি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও সন্ত্রাস নির্মূল করতে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভোক্তা অধিকারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অপচেষ্টা কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। নারী উন্নয়ন নীতি সুষ্ঠু বাস্তবায়ন করতে হবে। নারীর প্রতি সহিংসতা, নিপীড়ন ও বৈষম্যমূলক আচরণ বন্ধ এবং নারী ও শিশু পাচার রোধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের লক্ষ্যে শিক্ষা, ক্রীড়া, বিনোদন ও সৃজনশীল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শিশু-কিশোরদের মধ্যে ইতিহাস চেতনা, জ্ঞানস্পৃহা ও বিজ্ঞানমনষ্কতা জাগিয়ে তুলতে হবে। তিনি নির্দেশ দেন, কঠোরভাবে মাদক ব্যবসা, মাদক চোরাচালান ও এর অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে, ভূমি প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করে সরকারি ভূমি রক্ষায় সজাগ থাকবে হবে, পার্বত্য জেলাগুলোর উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি এ অঞ্চলের ভূ-প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীব-বৈচিত্র্য সংরক্ষণ করতে হবে। পর্যটনশিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্পের বিকাশে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে ডিসিদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, করাপশন দূর করতে হবে আমাদের। কারণ, কোনো কাজ করতে গেলে সেখানে যদি করাপশন হয়, আর সেটুকুই যদি খেয়ে ফেলে তাহলে আমার উন্নয়নের ছোঁয়াটা গ্রামবাংলায় বা কোথাও লাগবে না। কাজেই এ ব্যাপারে আপনাদের জনসচেতনতাও সৃষ্টি করতে হবে এবং নিজেদের এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে থাকতে হবে। শেখ হাসিনা বলেন, দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য, মানুষের ভাগ্য গড়ার জন্য কাজ করবে- এটাই যেন সবার লক্ষ্য হয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুকে উদ্ধৃত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, করাপশন আমার বাংলার কৃষক করে না। করাপশন আমার বাংলার মজদুর করে না। করাপশন করি আমরা শিক্ষিত সমাজ; যারা তাদের টাকা দিয়ে লেখাপড়া শিখেছে। তিনি বলেন, দেশকে ডিজিটালাইজড করতে তার সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে তার ফলে দুর্নীতিও নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে। এখন আর ওই টেন্ডারের বাক্স ছিনতাইয়ের ঘটনা খুব বেশি শোনা যাচ্ছে না। ডিজিটালাইজ করার ক্ষেত্রে কয়েকটা মন্ত্রণালয় এখনো একটু পিছিয়ে আছে। কিন্তু প্রতিটা ক্ষেত্রে আমরা ডিজিটালাইজড করে দেয়ার ফলে এখন অনেকটা স্বচ্ছতা চলে এসেছে। কাজেই এটা আমাদের অব্যাহত রাখতে হবে। সরকারি কাজের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং নতুন নতুন উপায় উদ্ভাবন করে সরকারি সেবা প্রদান সহজ করতে তার দপ্তরের অধীনে ‘গভর্নেন্স ইনোভেশন ইউনিট’ চালু করা হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, সরকারের মূল লক্ষ্য তৃণমূল পর্যায় থেকে উন্নয়ন করা। দেশের একটা মানুষও গৃহহীন থাকবে না। দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার পূরণে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ধন্যবাদ জানিয়ে দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে লক্ষ্য নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
Share on Google Plus

About বাংলা খবর

    Blogger Comment
    Facebook Comment

0 comments:

Post a Comment