চিকুনগুনিয়া নিয়ে আতঙ্ক বাড়ছে

দেশের সর্বত্র এখন চিকুনগুনিয়া আতঙ্ক বিরাজ করছে। রাজধানীতে ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশের অন্যান্য জেলায়ও চিকুনগুনিয়া জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। আক্রান্তদের অনেকে হাসপাতালে  ভর্তি হচ্ছেন। আবার কেউ কেউ বাড়িতেই চিকিৎসা নিচ্ছেন। তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরুতেই রাজধানীতে চিকুনগুনিয়া দেখা দেয়। গত তিন-চার মাসে এটি ব্যাপক আকার ধারণ করে। শুরুতে চিকুনগুনিয়ার বিস্তার ঠেকাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা সিটি করপোরেশন তেমন গুরুত্ব দেয়নি। এর প্রতিরোধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় রাজধানীতে এর ব্যাপকতা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। বর্তমানে তা গ্রামেও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। রাজধানীর বাইরে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে যেসব রোগীর সন্ধান মিলেছে, তারা ঢাকার মশা দ্বারা আক্রান্ত বলে দাবি করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। চিকুনগুনিয়া লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা নেই বলেও জানানো হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে। চিকুনগুনিয়া পর্যবেক্ষণে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) নিয়ন্ত্রণকক্ষ চালু করেছে গত ৩রা জুলাই। আইইডিসিআরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের গত ১১ই  জুলাই প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১০ই জুলাই পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত চিকুনগুনিয়া রোগীর সংখ্যা ৬২৫। ওইদিন ৮৯ জন লোক হটলাইনে এবং ২২ জন সরাসরি হাজির হয়ে চিকুনগুনিয়া সম্পর্কে তথ্য জানেন। এর মধ্যে বেশির ভাগ ঢাকার এবং কয়েকজন বরগুনা, বগুড়া ও চট্টগ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। অর্থাৎ রাজধানীর বাইরের জেলা থেকেও চিকুনগুনিয়ার খোঁজখবর নিচ্ছেন। এ ছাড়া ঢাকার বাইরে কিশোরগঞ্জের ভৈরব, নরসিংদী, সিলেট, ময়মনসিংহ, চিকুনগুনিয়া রোগীর খবর পাওয়া গেছে। এজন্য প্রতিটি জেলায় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলার জন্য সিভিল সার্জনদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর আগে গত জুলাই মাসে প্রতিষ্ঠানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকায় প্রতি ১১ জনের মধ্যে একজন লোক চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত। মুঠোফোনের মাধ্যমে পরিচালিত এক জরিপ থেকে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। বিষয়টি প্রথমে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক নিশ্চিত করলেও পরে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে ওই পরিসংখ্যান সঠিক নয় বলে জানানো হয়েছে। আইইডিসিআরের তথ্যমতে, চিকুনগুনিয়ার ভাইরাস এডিস ইজিপ্টি এবং এডিস এলবোপিকটাস মশার মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায়। এ ধরনের মশা সাধারণত দিনের বেলায় (ভোরবেলা অথবা সন্ধ্যার সময়) কামড়ায়। মশাগুলো সাধারণত পরিষ্কার বদ্ধ পানিতে জন্মে। এ ধরনের পরিবেশে বসবাসকারী মানুষের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বেশি। চিকুনগুনিয়া জ্বরের লক্ষণ হচ্ছে হঠাৎ জ্বর আসা, সঙ্গে গিঁটে গিঁটে প্রচণ্ড ব্যথা, মাথাব্যথা, মাংসপেশিতে ব্যথা, বমি বমি ভাব অথবা বমি, চামড়ায় লালচে দানা ওঠা। চিকুনগুনিয়া এমনি এমনিই সেরে গেলেও কখনো কখনো গিঁটের ব্যথা কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছরও থাকতে পারে। এই জ্বর ৩ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত হতে পারে। এ রোগ প্রতিরোধে কোনো ভ্যাকসিন নেই। চিকিৎসকরা বলেন, চিকুনগুনিয়া একটি মশাবাহিত রোগ। ঢাকার পর চিকুনগুনিয়া গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে। এটি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লে নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে। চিকুনগুনিয়া রোগ প্রতিরোধে কাজ করার কথা স্থানীয় সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। স্থানীয় সরকারের আওতাধীন সিটি করপোরেশন থেকে যদি মশা নিধন কর্মসূচি সঠিকভাবে পালন করা হতো, তা হলে মশার বংশবিস্তার হতো না। মশক নিধনের পাশাপাশি জনসেচতনতা বাড়ানো সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব। সিটি করপোরেশন রাস্তা ও বাড়ির আশপাশের মশা মারল এবং আবর্জনা পরিষ্কার করল; কিন্তু জনসচেতনতা সৃষ্টি না করায় বাসার ভেতরে যে মশা রয়েছে সেগুলো থেকে গেল। সচেতনতার অভাবে মশা নিধন কার্যক্রম সঠিকভাবে হলো না। ফলে করপোরেশনকে জনসচেতনতামূলক কর্মসূচিও পালন করতে হবে।
এদিকে, চিকুনগুনিয়া পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের সব সরকারি হাসপাতালে হেল্পডেস্ক খোলা হচ্ছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের নির্দেশে। পাশাপাশি চিকুনগুনিয়া আক্রান্ত রোগীদের শরীরের বিভিন্ন অস্থিসন্ধির ব্যথা প্রশমনে প্রতিটি হাসপাতালে প্রয়োজনে জয়েন্টপেইন ক্লিনিক বা আর্থালজিয়া ক্লিনিক খোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যেখান থেকে রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী ফিজিওথেরাপি বা ওষুধ সেবনের পরামর্শ দেয়া হবে। দেশের সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ জেলা ও উপজেলা হাসপাতালেও এই সেবা দেয়া হবে। গত বরিবার ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দেশের সব সরকারি হাসপাতালের পরিচালক, বিভাগীয় পরিচালক ও সিভিল সার্জনদের কাছে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এ নির্দেশনা পৌঁছে দেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, বিশেষ করে জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজধানীতে এডিস মশার বিস্তার ঘটে। এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু রোগের বিস্তার ঘটে। কিন্তু এবার ডেঙ্গু জ্বরের তেমন বিস্তার না ঘটলেও চিকুনগুনিয়া ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়েছে। চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে এডিস মশা নিধন জরুরি।
এদিকে, চিকুনগুনিয়া পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার (চিকুনগুনিয়া নিয়ন্ত্রণ কক্ষ) খোলা হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে। এ ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা কাজ করার জন্য একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হয়েছে আইইডিসিআর প্রতিষ্ঠান থেকে। সার্বক্ষণিক হটলাইনও চালু করা হয়েছে, যার ফোন নম্বর হচ্ছে ০১৯৩৭-১১০০১১ এবং ০১৯৩৭-০০০০১১। চিকুনগুনিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে িি.িরবফপৎ.মড়া.নফ লিংক ভিজিট করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পথকে অনুরোধ করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, এডিস মশা ডেঙ্গু আর চিকুনগুনিয়ার বাহক। ডেঙ্গুজ্বরের সঙ্গে চিকুনগুনিয়ার অনেক পার্থক্য রয়েছে। ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্তদের সাধারণত দীর্ঘ সময় শরীর ব্যথা বা অন্য কোনো সমস্যা থাকে না। জ্বর ভালো হয়ে গেলে কয়েকদিন দুর্বলতা বা ক্লান্তি থাকতে পারে। কিন্তু চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তদের জ্বর সেরে গেলেও ব্যথা থাকতে পারে দীর্ঘ সময়। আক্রান্তদের অনেকেই দীর্ঘদিনের জন্য স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারেন। তিনি বলেন, অন্য ভাইরাস জ্বরের মতো চিকুনগুনিয়ার নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। কেউ চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হলে রোগীকে বিশ্রামে থাকার পাশাপাশি প্রচুর পানিসহ অন্য তরল খেতে হবে। জ্বর হলে প্যারাসিটামল খেতে হবে। পানি দিয়ে শরীর মুছিয়ে দিতে হবে। আক্রান্ত রোগীকে মশারির ভেতরে রাখতে হবে।
Share on Google Plus

About বাংলা খবর

    Blogger Comment
    Facebook Comment

0 comments:

Post a Comment