জুয়ায় হার by মোহাম্মদ আবুল হোসেন

রাজনীতির জুয়ায় হেরে গেছেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে। সরকারের মেয়াদ ৩ বছর বাকি থাকতেই তিনি এই খেলায় নেমেছিলেন। ঘোষণা দিয়েছিলেন আগাম নির্বাচনের। ওই ঘোষণার সময় তার দল শতকরা ২৮ ভাগ সমর্থন নিয়ে এগিয়ে থাকলেও মূল লড়াইয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। ফলে ক্ষমতায় টিকে থাকতে তাকে ভর করতে হচ্ছে স্বল্প পরিচিত নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট (ডিইউপি) পার্টির ওপর। এবার ১০টি আসন পেয়েছে তারা। দলটি ব্রেক্সিটপন্থি, গর্ভপাত বিরোধী এবং এলজিবিটি অধিকারে বিশ্বাস করে না। অগত্যা তাদের সঙ্গেই জোট বাঁধতে হচ্ছে তেরেসা মে’কে। তবে এই জোট আনুষ্ঠানিক নয়। ইস্যু ভিত্তিতে সরকারকে সমর্থন দেবে ডিইউপি। এর মাধ্যমে যে জোট সরকার গঠিত হচ্ছে তাতে বৃটেনে স্বস্তি ফিরবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। ফলে নতুন করে এক রাজনৈতিক সঙ্কটে পড়েছে বৃটেন। তেরেসা মে ব্রেক্সিটকে সামনে রেখে আরো কর্তৃত্ব হাতে নেয়ার জন্য এ নির্বাচন ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু রাজনীতিতে ঘটে গেছে ভূমিকম্প। তিনি সরকার গঠনের ঘোষণা দিলেও চারদিকে শোনা যাচ্ছে অশনি সংকেত। কেউ কেউ পূর্বাভাস দিচ্ছেন এর ফলে বৃটেনে আরেকটি নির্বাচন আসন্ন। অর্থাৎ তেরেসা মে’র নতুন সরকার বেশি দিন স্থায়ী নাও হতে পারে। তিনি সরকার গঠন করার ঘোষণা দিলেও আশঙ্কা ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, কোন্‌ দিকে মোড় নেবে বৃটেনের পরবর্তী রাজনীতি! ব্রেক্সিট প্রক্রিয়ার কি হবে! পার্লামেন্ট নির্বাচনে কোন দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় নতুন পার্লামেন্ট হচ্ছে ঝুলন্ত। কেউ কেউ এটাকে স্তব্ধ পার্লামেন্ট বলে বর্ণনা করেছেন। এমন পার্লামেন্ট স্বাভাবিকভাবেই হয় অত্যন্ত দুর্বল। প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’র পদত্যাগ দাবি করেছেন বিরোধী লেবার নেতা জেরেমি করবিন। মিডিয়ায় খবর, নিজ দল কনজারভেটিভের অনেক সদস্য তেরেসা মে থেকে দূরত্ব বজায় রাখছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এ নির্বাচনের মাধ্যমে মারাত্মক এক রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখোমুখি হয়েছে বৃটেন। আর মাত্র ৯ দিন পরেই ঐতিহাসিক ব্রেক্সিট সমঝোতার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম। কিন্তু উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তা বিলম্বিত হতে পারে। বিশ্বের মিডিয়াগুলোর শিরোনামে চোখ রাখলে ধরা পড়ছে কি এক ভয়াবহ ভুল করেছেন প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে। তিনি আগাম নির্বাচন না দিলে বড় কোনো ক্ষতির আশঙ্কা ছিল না। কিন্তু কেন তিনি এ রিস্ক নিলেন! একক কর্তৃত্ব হাতে নিতে চেয়েছিলেন ব্রেক্সিট সমঝোতায়। কিন্তু সে গুড়েবালি। এখন এক কঠিন সময়ের মুখোমুখি তিনি। নিয়ম অনুযায়ী বৃটেনে পার্লামেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালের মে মাসে। কিন্তু ব্রেক্সিট সমঝোতাকে সামনে রেখে গত ১৯শে এপ্রিল তিনি আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন। ঘোষণা দেন ৮ই জুন নির্বাচনের। পার্লামেন্টে ৫২২-১৩ ভোটে তার এ প্রস্তাব পাস হয়। প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় তাকে সমর্থন করে পার্লামেন্ট। তিনি ব্রেক্সিট সমঝোতায় নিজের হাতকে আরো শক্তিশালী করার জন্য এ পরিকল্পনাকে সামনে ঠেলে দেন। কিন্তু হিতে বিপরীত হয়েছে। বৃহস্পতিবার বৃটেনজুড়ে এ নির্বাচন হয়। মোট ৬৫০ আসনের মধ্যে ৬৪৯ আসনের ফল ঘোষণা করা হয়েছে। তাতে গত নির্বাচনের চেয়ে ১২টি আসন হারিয়েছে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টি। তারা পেয়েছে মোট ৩১৮ টি আসন। বিরোধী লেবার দল চমক দেখিয়েছে। তারা আগের নির্বাচনের চেয়ে এবার ২৯টি আসন বেশি পেয়েছে। তাদের মোট আসন দাঁড়িয়েছে ২৬১। স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি (এসএনপি) হারিয়েছে ২১ টি আসন। তারা বিজয়ী হয়েছে ৩৫ আসনে। বাদ বাকি আসনগুলো পেয়েছে ছোটখাট দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’র দল কনজারভেটিভ বেশি আসনে বিজয়ী হলেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে বৃটেনে অবশ্যই ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হচ্ছে। তিনি নিজের হাতকে শক্তিশালী করতে গিয়ে একেবারে দুর্বল করে ফেলেছেন। বলা হচ্ছে, বৃটিশ ভোটাররা বিস্ময়করভাবে আঘাত করেছেন তেরেসা মে’কে। আর তারই সূত্র ধরে তার পদত্যাগ দাবি ওঠে। নির্ধারিত সময়ের তিন বছর আগেই দেয়া এ নির্বাচনের ফলকে অনলাইন সিএনএন ‘ভূমিকম্প’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। স্কাই নিউজে বলা হয়, বৃটেনকে ঝুলন্ত পার্লামেন্টে ঠেলে দিয়ে তেরেসার মুখ লাল হয়ে গেছে। অনলাইন বিবিসি’র শিরোনাম, তেরেসা মে’র ওপর চাপ বাড়ছে। অনলাইন গার্ডিয়ান বৃহস্পতিবার নির্বাচনী ফল ঘোষণার রাতকে ‘ইলেকট্রিক শক’ বা বৈদ্যুতিক শক বলে আখ্যায়িত করেছে। বলা হয়েছে, এতে তেরেসা মে রাজনৈতিকভাবে ঝলসে গেছেন। অনলাইন এক্সপ্রেস লিখেছে, নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও ডিইউপি’কে সঙ্গে নিয়ে ঝুলন্ত পার্লামেন্ট গঠন করতে চাইছেন তেরেসা মে। এর মাধ্যমে তিনি কোনোমতে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। নির্বাচনের এ ফলকে সিএনএন তেরেসা মের জন্য বিপর্যয়কর বলে আখ্যায়িত করেছে। তারা বলছে, এর মধ্য দিয়ে বৃটেন নতুন করে রাজনৈতিক এক বিশৃঙ্খলায় প্রবেশ করেছে। অর্থমন্ত্রীর পদ ত্যাগ করা জর্জ অসবর্ন আইটিভি’কে তার দলের জন্য নির্বাচনের ফলকে সর্বনাশা (ক্যাটাস্ট্রোফিক) বলে আখ্যায়িত করেছেন। কনজারভেটিভ দলের এমপি আন্না সুব্রি প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’র অবস্থান পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে তেরেসা মে পদত্যাগ করবেন না। তিনি ডিইউপি’কে নিয়ে সরকার গঠন করবেন। গতকালই এ বিষয়ে অনুমতির জন্য রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন তিনি। রানীর অনুমতি নিয়ে নতুন সরকার গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। তবে সে সরকার কোনোভাবেই শক্তিশালী হবে না বলে বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এমন পূর্বাভাস আগে থেকেই দিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কারণ, তেরেসা মে ‘হার্ড ব্রেক্সিট’ বা কঠোরতর ব্রেক্সিট সমঝোতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ছোট্ট একটি দলকে নিয়ে ঝুলন্ত পার্লামেন্টে সরকার গঠন করলে সেই কঠোরতর সমঝোতা কঠিন হয়ে পড়বে। এক্ষেত্রে সতর্কতা দিয়েছে ইউরোপ। তারা বলেছে, দুর্বল সরকারের সঙ্গে ব্রেক্সিট সংলাপ হবে দুর্বল। বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, ব্রেক্সিট সংলাপ নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। বৃটিশ নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর তেরেসা মে গঠন করতে যাচ্ছেন ভঙ্গুর সরকার।
Share on Google Plus

About সায়রা সালমা

    Blogger Comment
    Facebook Comment

0 comments:

Post a Comment