হঠাৎ অবসরের ঘোষণা মাশরাফির by ইশতিয়াক পারভেজ

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচ। টসের পর দুই অধিনায়ক সাধারণত ম্যাচ নিয়েই কথা বলেন। কিন্তু গতকাল এ কথা শেষ হতেই মাশরাফি হঠাৎ ঘোষণা দিলেন, এটিই তার শেষ টি-টোয়েন্টি সিরিজ। ছোট্ট একটি বাক্যে। তবে তা রেখে যায় অনেক বড় রহস্য হয়তো ধারাভাষ্যকার ও লঙ্কান অধিনায়ক উপল থারাঙ্গাও অবাক হয়েছেন। কিন্তু টসের ১০ মিনিট  আগেই নিজের ফেসবুক পেজে তিনি এই ঘোষণা দেন। মুহূর্তের মধ্যেই সেই  ছোট্ট একটি বাক্যের তীব্রতা ভারত সাগর হয়ে বঙ্গোপসাগরের ঢেউকে উত্তাল করে তোলে। এক দ্বীপে মাশরাফির সেই রহস্যময় ঘোষণার উত্তাপ ছড়িয়ে আরেক দ্বীপে। প্রশ্ন একটাই- হঠাৎ কেন টি-টোয়েন্টিকে বিদায় বললেন মাশরাফি?’ মুহূর্তের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ঝড় উঠেছে। সবাই এই  রহস্যের পিছনের কারণ খুঁজছেন। কেউ বলছেন টিম ম্যানেজম্যান্টের সঙ্গে দ্বন্দ্ব। কেউ বলছেন দ্বন্দ্বটা প্রধান কোচ চন্ডিকা হাথরুসিংহের সঙ্গে আবার কেউ বলছেন বিসিবির নানা রকম বক্তব্য ও সিদ্ধান্তে বিরক্ত হয়েই মাশরাফির এই  ঘোষণা! তবে প্রশ্ন হচ্ছে দ্বন্দ্ব হলে শুধু টি-টোয়েন্টি থেকে অবসর কেন? ওয়ানডে থেকে কেন নয়! আবার প্রশ্ন উঠছে ঠিক ম্যাচ শুরুর আগে কেন এই ঘোষণা? ঝামেলাটাকি খেলার শুরুর আগে বাধলো। এই সব প্রশ্নের উত্তর হয়তো জানা যাবে মাশরাফি মুখ খুললেই। তাহলেই বের হবে এই রহস্যময় ঘোষণার পেছনের কারণ!
মাশরাফি বিন মুর্তজা- বাংলাদেশে ক্রিকেটে এই নামটি হয়ে থাকবে ধ্রুব তারা। ২০০১ সালে টেস্ট ও ওয়ানডেতে অভিষেকের পর থেকেই হয়ে উঠেছেন রিয়েল টাইগার। একের পর এক ইনজুরি তাকে দল থেকে ছিটকে ফেলেছে। তবুও হাল ছাড়েননি তিনি। ২০১১ সালে ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ মিলেনি।  চোখের চলে ভাসলেও ভেঙে পড়েননি। অবশেষে ২০১৪ সালে একেবারে খাদের কিনারাতে পৌঁছে যাওয়া বাংলাদেশ দলের দায়িত্ব পান। শুধু সীমিত ওভারের দুই ফরমেটে। কারণ ২০০৯ সালে ইনজুরির পর তার আর টেস্টে সাদা পোশাকে মাঠে নামা হয়নি। ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টির দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে বদলে যেতে থাকে দলের চেহারা। তার নেতৃত্বে দুই ফরমেটে একের পর এক জয়ে বিশ্বক্রিকেটে ছড়িয়ে পড়ে টাইগারদের হুঙ্কার। ওয়ানডেতে ৪০ ম্যাচে ২৪ জয় এনে দিয়ে এখন তিনি ছাড়িয়ে যাওয়ার অপেক্ষাতে সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার সুমন ও সাকিব আল হাসানকে। বাশার ৬৯ ম্যাচে ২৯টি ও সাকিবের নেতৃত্বে ৪৯ ম্যাচে জয় এসেছে ২৩টি। কিন্তু টি-টোয়েন্টিতে এখন দেশের সেরা অধিনায়ক মাশরাফি। সবচেয়ে বেশি ২৭ ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়ে জয় পেয়েছেন ৯টিতে। তার পরই মুশফিকুর রহীমের নেতৃত্বে জয় এসেছে ২৩ ম্যাচে ৮টিতে। মাশরাফির নেতৃত্বেই ওয়ানডের পর টি-টোয়েন্টিতেও বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে দারুণ ভাবে। ২০০৬ সালে অভিষেকের পর থেকে দেশের হয়ে খেলেছেন ৫২টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ। এর মধ্যে তুলে নিয়েছেন তৃতীয় সর্বোচ্চ ৩৯টি উইকেটও। দলের এই লড়াকু ক্রিকেটার ও অধিনায়কে কেন এমন ভাবে বিদায় বলবেন?
শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচের টস হওয়ার কথা ছিল সন্ধ্যা ৭টায়। তার ঠিক ১০ মিনিট আগে ফেসবুকে এরপর মাঠে টসের পর মৌখিক ভাবে এই ঘোষণা দেন তিনি। তার অফিসিয়াল ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, ‘আমি মনে করি, টি-টোয়েন্টি ফরম্যাট থেকে অবসর নেয়ার জন্য এটাই আমার উপযুক্ত সময়, যাতে অনেক তরুণ উদীয়মান ক্রিকেটার তাদের প্রতিভা তুলে ধরতে পারে এবং বিসিবি তাদেরকে সঠিক দিক নির্দেশনা দিতে পারে।’ কিন্তু ঠিক ম্যাচের আগে এই ঘোষণা কেন? তাহলে কি দলের একাদশ গঠন নিয়ে কোন দ্বন্দ্ব হয়েছিল কোচ ও টিম ম্যানেজম্যান্টের সঙ্গে। কেউ কেউ দাবি করছেন মেহেদী হাসান মিরাজের একাদশে থাকা না থাকা নিয়েই এই দ্বন্দ্ব। তবে সবই এখন ধারনা। কিন্তু বেশ কিছুদিন থেকে ঘটে যাওয়া একের পর ঘটনার এটাই শেষ পরিণতি বলে মনে করেন ক্রিকেট বোদ্ধারা। 
অবসর নিয়ে যা বললেন মাশরাফি
টি-টোয়েন্টি থেকে অবসর ঘোষণার পর নিজের অফিসিয়াল পেজে মনের কথা লিখেন টাইগারদের সফলতম অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। ক্রিকেট বোর্ডকে ধন্যবাদ জানিয়ে দলের ওপর আস্থার কথাও জানান অধিনায়ক। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ টিমকে টি-টোয়েন্টি ইন্টারন্যাশনালে ১০ বছরের বেশি সময় ধরে প্রতিনিধিত্ব করা আমার জন্য অনেক গর্বের। আমি বিশ্বাস করি, বর্তমান দলটি একটি ভালো দল এবং দলে কিছু উদীয়মান খেলোয়াড় আছে। আমার উপর আস্থা রাখার জন্য এবং আমাকে এত চমৎকার দলের নেতৃত্ব প্রদানের সুযোগ দেয়ার জন্য বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এবং ‘উচ্চপদস্থ’ কর্মকর্তাদের প্রতি আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।’
সেই সঙ্গে টি-টোয়েন্টিতে দেশের  ভবিষ্যৎ অধিনায়ককে শুভ কামনাও জানিয়েছেন অধিনায়ক। মাশরাফি বলেন, ‘আমি আমার সকল ভক্ত, পরিবার এবং বন্ধুদের প্রতি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ আমাকে সবসময় সমর্থন করার জন্য। এই সুদীর্ঘ ক্যারিয়ারে উত্থান এবং পতন ছিল। আমি সবসময় চেষ্টা করেছি আমার ফ্যানদেরকে খুশি করার। আমি আমার প্রত্যেক ফ্যানের কাছে তাদের প্রতি ম্যাচে খুশি করতে না পারার জন্য ক্ষমা চাইছি। এই মুহূর্তে দল হিসেবে আমরা ভালো খেলছি। আমি নিশ্চিত বাংলাদেশ সামনের দিনগুলোতেও ভালো ক্রিকেট খেলবে। আমি বাংলাদেশ-এর টি-টোয়েন্টি টিমের নতুন অধিনায়ককে আগাম অভিনন্দন জানাই এবং আমি নিশ্চিত বাংলাদেশ ক্রিকেটের সেরা সময় সামনে আসবে। শিগগিরই আবার দেখা হবে। সবার জন্য আমার আন্তরিক ভালোবাসা।’
Share on Google Plus

About বাংলা খবর

    Blogger Comment
    Facebook Comment

0 comments:

Post a Comment