প্রতিরক্ষাবিষয়ক দুই সমঝোতা সই হচ্ছে




প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফরে প্রতিরক্ষা বিষয়ক দুটি সমঝোতা স্মারক সই হতে যাচ্ছে। দিল্লির সাউথ ব্লক সূত্র বলছে, এই দুই সমঝোতার মেয়াদ হবে পাঁচ বছর। বিদ্যমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কাঠামোকে সামনে আরো বিস্তৃত ও দৃঢ় করাই হবে এই সমঝোতার লক্ষ্য। প্রধানমন্ত্রীর সফরে এ দুটি সমঝোতা স্মারকসহ ২০টির বেশি চুক্তি ও সমঝোতা হবে। গতকাল দুপুরে দিল্লিতে প্রটোকল ভেঙে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গুরুত্বপূর্ণ এই সফরে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়ার দৃঢ় প্রত্যাশার কথা জানিয়ে মোদি টুইট করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানানোর পরই। সফরের গুরুত্বপূর্ণ দিন আজ দ্বিপক্ষীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে। চুক্তি ও সমঝোতার বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য অনেক কিছুই খোলাসা করেছে বৃহস্পতিবার। সেখানে বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব শ্রীপ্রিয়া রঙ্গনাথান বলেন, প্রতিরক্ষা খাতে দুটি পৃথক সমঝোতা স্মারকসহ দু’দেশের মধ্যে ২০টি’র বেশি চুক্তি ও সমঝোতা সই হবে। শনিবার হায়দারাবাদ হাউজে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যকার শীর্ষ বৈঠক শেষে চুক্তি সইয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে। দিল্লি আনুষ্ঠানিক ওই ঘোষণার বরাতে বিবিসি বাংলাসহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রতিরক্ষা বিষয়ক সমঝোতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও বিশ্লেষণ ছাপা হয়েছে। তাতে বলা হয়- ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে প্রতিরক্ষা বিষয়ক দু’টি এমওইউ বা সমঝোতা-স্মারকের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর করে, ২৫ বছর নয়। এর একটি দু’দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে একটা নির্দিষ্ট কাঠামোর ভেতর নিয়ে আসবে। আর অন্যটি হবে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনাকাটা সংক্রান্ত। বিবিসি বাংলার রিপোর্টে সমঝোতা নিয়ে যে জল্পনা-কল্পনা ছিল তার উল্লেখ করা হয়েছে এভাবে- ‘গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র জল্পনা ছিল, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে দুই দেশের মধ্যে কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তি বা সমঝোতা হবে কি না, বা হলেও কী আকারে হবে।’ খবরে বলা হয়- প্রধানমন্ত্রী হাসিনার ভারতে পা-রাখার ঠিক আগের দিন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (বৃহস্পতিবার) স্পষ্ট করে জানিয়ে দিলো ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে প্রতিরক্ষা সমঝোতা হচ্ছে- আর একটি নয়, বরং দুটি। ভারতের বাংলাদেশ ডেস্কের যুগ্ম সচিব শ্রীপ্রিয়া রঙ্গনাথনকে উদ্ধৃত করে বলা হয়- এর একটা হবে ফ্রেমওয়ার্ক এমওইউ, অর্থাৎ যা দু’দেশের ভেতরে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে পরবর্তী কয়েক বছরের জন্য একটা নির্দিষ্ট কাঠামোর ভেতর  নিয়ে আসবে। তবে এটার মেয়াদ ২৫ বছর নয়- কিন্তু পাঁচ বছর পরপর সাধারণত এই সমঝোতা-স্মারকগুলো আপনি আপনি নবায়ন হয়ে যাবে। এই দুটি প্রতিরক্ষা এমওইউ-তে ঠিক কী থাকবে, তারও একটা ধারণাও দিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। শ্রীপ্রিয়া রঙ্গনাথন এই দুটো সমঝোতার বিষয়বস্তু ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের যে ধরনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আছে এবং আগামী দিনে যেটাকে আমরা আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই, তার একটা ফ্রেমওয়ার্ক বা কাঠামো থাকবে এই সমঝোতায়। প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত গবেষণা বা রিসার্চ-ডেভেলপমেন্ট, প্রতিরক্ষা রসদ সরবরাহেরও অবকাশ থাকবে সেখানে।’ আর দ্বিতীয় যে সমঝোতাটা হচ্ছে তার লক্ষ্য হলো বাংলাদেশ যাতে তাদের প্রতিরক্ষার প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু কিছু সরঞ্জাম ভারত থেকে কিনতে পারে, সেটা নিশ্চিত করা।’ বিবিসি বলছে, প্রতিরক্ষা খাতে এটাকে দু্থদেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবেই দেখছেন পর্যবেক্ষকরা। এদিকে প্রতিরক্ষা বিষয়ক এমওইউ বা সমঝোতা নিয়ে কলকাতার আনন্দবাজার বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ওই রিপোর্টে বলা হয়, দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ঘণ্টা বাজিয়ে সুপ্রতিবেশীকে সরব সতর্ক করা নয়। বরং এমওইউ’র মোড়কে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে বড় মাপের সমঝোতার পথে হাঁটতে চলেছে ভারত। শেখ হাসিনার আসন্ন সফরে (আজ) দু’দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে দু’টি সমঝোতাপত্র সই হবে। বাংলাদেশকে সমরাস্ত্র কেনার জন্য দেয়া হবে ৫০ কোটি ডলার ঋণ-সাহায্য। সব মিলিয়ে এরপর দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ভূ-কৌশলগত রাজনীতিতে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় পৌঁছানো যাবে বলে আশা করছে নয়াদিল্লি- এমনটাও ছাপা হয়েছে। আনন্দবাজারের রিপোর্টে বলা হয়- এটা বাস্তব যে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে বেইজিং-ঢাকা অক্ষ চাপ বাড়িয়েছে নয়াদিল্লির। দীর্ঘদিন আগেই সামরিক সহযোগিতা নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের চুক্তি হয়ে গেছে।  সম্প্রতি বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী এলাকায় ভারতীয় সামরিক ঘাঁটিগুলোর উপর নজরদারি এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দখলদারি রাখতে বেইজিং-এর সক্রিয়তা বাড়ছে উল্লেখ করে রিপোর্টে বলা হয়- সেই পরিকল্পনা রূপায়ণে ঢাকাকে পাশে পেতেও ক্রমশ প্রভাব বাড়াচ্ছে চীন। পদ্মা সেতু থেকে শুরু করে বাংলাদেশের বিভিন্ন পরিকাঠামোয় বেইজিং যে অর্থ দিচ্ছে তার উল্লেখ করে বলা হয়- গত দু’বছরে বাংলাদেশকে আড়াই হাজার কোটি ডলার অর্থসাহায্য করেছে চীন, যার একটা ভালো অংশ সামরিক ক্ষেত্রে। এই প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার সফরে প্রতিরক্ষা নিয়ে সমঝোতাপত্রে সই-এর বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের ঘরোয়া রাজনীতিতে ভারতের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা নিয়ে বিরোধিতার ঝড় উঠেছে। সে দেশের বিএনপি-জামায়াত জোট এবং নাগরিক সমাজের একাংশ এ কথাও বলছে, যে অর্থের বিনিময়ে নিরাপত্তাকেও ভারতের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে হাসিনা সরকার। আর তাই এ ব্যাপারে কিছুটা সতর্কতার সঙ্গে নিচু তারে বিষয়টিকে বাঁধার পরিকল্পনা করা হয়েছে। লক্ষ্য এক, বাংলাদেশে হাসিনা সরকারকে চাপে না ফেলা। দুই, চীনের উদ্দেশেও খুব ঢাকঢোল পিটিয়ে কোনো বার্তা না দেয়া। পাশাপাশি ঘরোয়া সমালোচনার প্রতিবাদে শেখ হাসিনা জানিয়েছেন যে তিনি ভারতের সঙ্গে যখন চুক্তি করবেন, সেখানে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রেখেই করবেন। দেশবাসীর কাছে কিছুই গোপন রাখবেন না। কিন্তু প্রতিরক্ষার মতো বিষয়ে কিছু গোপনীয়তা রাখা ভারতীয় কৌশলের মধ্যে পড়ে। তাই বেণী না ভিজিয়ে স্নান করার একটি কৌশল হিসাবে এখনই ভারত-বাংলাদেশ সমঝোতাকে চুক্তির আকার না দিয়ে, তার আগের ধাপ ‘এমওইউ’-সই করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে রিপোর্টে বলা হয়েছে। সেখানে সাউথ ব্লকের বাংলাদেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব শ্রীপ্রিয়া রঙ্গনাথনের সংবাদ সম্মেলনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়- তিনি বলেছেন, দু’দেশের মধ্যে চলতি সামরিক সহযোগিতাগুলোকে একটি ছাতার তলায় নিয়ে এসে একটি সামগ্রিক ‘ফ্রেমওয়ার্ক’ তৈরি করা হবে। যার মধ্যে রয়েছে সাবমেরিন-প্রশিক্ষণ, তথ্য সহযোগিতা, উপকূলরক্ষীদের মধ্যে সহযোগিতা, সেনাপ্রধান পর্যায়ে আদান-প্রদানের মতো বিষয়। এছাড়া ভারত থেকে সমরাস্ত্র এবং সামরিক প্রযুক্তি কেনার জন্য বাংলাদেশকে ৫০ কোটি ডলার ঋণ দেয়া হবে।
Share on Google Plus

About Nejam Kutubi

    Blogger Comment
    Facebook Comment

0 comments:

Post a Comment