ছেলে মেয়ে জামাইসহ রাগিব আলীর কারাদণ্ড



শিল্পপতি রাগিব আলীকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আদালত তার ছেলে আবদুল হাইসহ ৪ জনকে ১৬ বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছেন। তারাপুর চা বাগানের সম্পত্তি দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ মামলায় রাগিব  আলীর বিরুদ্ধে এ রায় ঘোষণা করা হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে সিলেটের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাইফুজ্জামান হিরো এ রায় ঘোষণা করেন। এ সময় আদালতে রাগিব আলী ও তার ছেলে আবদুল হাই উপস্থিত ছিলেন। ১৬ বছর করে সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন তার ছেলে আবদুল হাই, জামাতা আবদুল কাদির ও মেয়ে রুজিনা কাদির এবং তার নিকটাত্মীয় মৌলভীবাজারের রাজনগরের বাসিন্দা দেওয়ান মোস্তাক মজিদ। আসামিদের মধ্যে কাদির ও রুজিনা আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের পর থেকে পলাতক। এছাড়া মামলার আরেক আসামি তারাপুর চা বাগানের দেবোত্তর সম্পত্তির সেবায়েত পঙ্কজ কুমার গুপ্তকে খালাস দিয়েছেন আদালত। রায়ে রাগীব আলীকে ৪৬৭ ও ৪৬৮ ধারায় ৬ বছর করে ও ৪২০ ও ৪৭১ ধারায় এক বছর করে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এছাড়া দণ্ডিত অন্য চার জনের প্রত্যেককে ৪৬৭ ও ৪৬৮ ধারায় সাত বছর ও ৪২০ ও ৪৭১ ধারায় এক বছর করে কারাদণ্ডাদেশ দেয়া হয়েছে। তাছাড়া দণ্ডিত পাঁচজনকেই প্রতিটি ধারায় ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরো ৩ মাস করে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। গতকাল মামলার রায়ের পর বেরিয়ে এসে সিলেট জেলা আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, আদালত সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে এ রায় দিয়েছেন। রায়ে রাগিব আলী ও তার ছেলের কারাদণ্ড প্রদান ছাড়া আরো তিনজনকেও দণ্ডিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে এক আসামি পংকজ গুপ্তকে খালাস প্রদান করেছেন। তিনি বলেন, আমরা মামলার রায় সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানাবো। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবদুল মুকিত অপি জানিয়েছে, এ মামলার রায়ে তারা হতাশ। ন্যায় বিচার পাননি। তারা এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন বলে জানান। দেবোত্তর সম্পত্তির চা বাগান বন্দোবস্ত নেয়া ও চায়ের ভূমিতে বিধিবহির্ভূত স্থাপনা করার অভিযোগে ২০০৫ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর সিলেটের তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) এসএম আবদুল কাদের বাদী হয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের স্মারক জালিয়াতি ও সরকারের এক হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা দুটি করেন। তবে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে মামলার নিষ্পত্তি করে দেয় পুলিশ। ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিবের স্বাক্ষর জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে দেবোত্তর সম্পত্তি দখলের দুটি মামলা গত বছরের ১৯ জানুয়ারি পুনরুজ্জীবিত করার নির্দেশ দেন সুপ্রিম কোর্ট। গত বছরের ১০ই জুলাই আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল এবং ১২ই আগস্ট আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলে এদিনই রাগীব আলী ও তার ছেলে আবদুল হাই সপরিবারে ভারতে পালিয়ে যান। ১২ই নভেম্বর দেশে ফেরার পথে জকিগঞ্জ সীমান্তে আবদুল হাই ও ২৩শে নভেম্বর ভারতের করিমগঞ্জে গ্রেপ্তার হন রাগীব আলী। গত বছরের ১৪ই ডিসেম্বর থেকে আলোচিত এ মামলায় ১৪ সাক্ষীর মধ্যে ১১ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। গত ১৭ই জানুয়ারি রাগীব আলীর পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেন তারই মালিকানাধীন মালনিছড়া চা বাগানের সহকারী ম্যানেজার মাহমুদ হোসেন চৌধুরী ও আবদুল মুনিম। গত ২৩শে ফেব্রুয়ারি সকল পক্ষের শুনানি শেষে ২৬শে ফেব্রুয়ারি রায়ের দিন ধার্য করেন আদালত। কিন্তু মামলায় অভিযুক্ত রাগীব আলীর ছেলে আবদুল হাইয়ের মানসিক স্বাস্থ্যগত কারণ দেখানোয় রায় ঘোষণা পিছিয়ে যায়। ৩০শে মার্চের মধ্যে আবদুল হাইয়ের স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রতিবেদন দাখিলে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগের চিকিৎসককে নির্দেশ দেন আদালত। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যথাসময়ে প্রতিবেদন না দেয়ায় ফের ৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন আদালত। সে প্রেক্ষিতে গত ২রা এপ্রিল আদালতে স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রতিবেদন দেয়া হয়। তাতে স্বাস্থ্যগত মানসিক সমস্যা ধরা পড়েনি। প্রতিবেদন দাখিলের পর পরই উচ্চ আদালতের নির্দেশে আদালত স্থগিত করা রায় ঘোষণার নতুন দিন গতকাল ধার্য করা হয়। এর প্রেক্ষিতে গতকাল রায় ঘোষণা করা হয়। এদিকে গত ২রা ফেব্রুয়ারি তারাপুর চা বাগানের ভূমি বন্দোবস্তের নামে ভূমি মন্ত্রণালয়ের স্মারক জালিয়াতি মামলার রায় দেন একই আদালত। রায়ে রাগিব আলী ও তার ছেলেকে ১৪ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেয়া হয়। এছাড়া মামলায় আদালত থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ইস্যুর পর পলাতক থাকাবস্থায় পত্রিকা প্রকাশের কারণে রাগীব আলী ও তার ছেলের বিরুদ্ধে দায়ের করা অন্য একটি মামলার রায়ে রাগীব আলী ও তার ছেলেকে এক বছর করে কারাদণ্ড দেন মহানগর মুখ্য হাকিমের আদালত। বর্তমানে এসব মামলায় কারাগারে সাজা ভোগ করছেন রাগীব আলী ও তার ছেলে আবদুল হাই।
Share on Google Plus

About Nejam Kutubi

    Blogger Comment
    Facebook Comment

0 comments:

Post a Comment