প্রাথমিক শিক্ষার মান নিয়ে ক্ষুব্ধ অধিদপ্তর by নূর মোহাম্মদ





প্রাথমিক শিক্ষায় সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের পরও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসছে না। এ অবস্থায় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই)-এর মহাপরিচালক ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল ৯ ধরনের নির্দেশনামূলক বার্তা দিয়ে মাঠ প্রশাসন ও শিক্ষকদের সতর্ক করেছেন। এসব নির্দেশনা অমান্য করলে বিভাগীয় ব্যবস্থাসহ আইনি ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
গত ২রা মার্চ পাঠানো ওই চিঠিতে বলা হয়, সারাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার মান, শিক্ষার পরিবেশ, আর্থিক স্বচ্ছতা, ঝরেপড়া রোধে শিক্ষকদের আন্তরিকতার অভাব, প্রশিক্ষণ ক্লাসরুমে ব্যবহার না করা, খেলাধুলা ও বিদ্যালয়ের পরিবেশ নষ্ট করার মতো গর্হিত কাজে লিপ্ত হচ্ছে প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকরা। শিক্ষকদের এসব কাজে জোগান দিচ্ছে বিভাগীয় উপ-পরিচালক, জেলা ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, সুপারিনটেনডেন্ট পিটিআই ও পিটিআই ইনস্ট্রাকটরা।
চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, সরকার বিভিন্ন ধাপে প্রাথমিক স্কুল জাতীয়করণ, শিক্ষকদের বেতন ভাতা বৃদ্ধি, মর্যাদা, জীবন মান উন্নয়নে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। এরপরও বিগত বছরগুলোতে জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন ফলাফলে শিক্ষার্থীদের প্রান্তিক যোগ্যতা অর্জন ও শিক্ষার মান সংক্রান্ত প্রবণতা প্রকট এবং হতাশাজনক চিত্র উঠে এসেছে। শিক্ষকরা দায়িত্ব পালনে প্রত্যাশা অনুযায়ী সফল হতে পারেননি, যা অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত। মহাপরিচালক মনে করেন, শুধু পর্যাপ্ত শিক্ষক, শিক্ষার অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ দিয়ে শিক্ষার মান নিশ্চিত করা যাবে না। এজন্য দরকার সৎ, দক্ষ, দেশপ্রেমিক, মানবিক গুণাবলি সম্পন্ন শিক্ষক দরকার।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, গত আট বছরে প্রায় দেড় লাখ শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। শিক্ষকদের দক্ষ করতে নানা ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে যথাযথভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না। এমন কি মাঠ পর্যায়ের পরিদর্শন কর্মকর্তারাও অনেক ক্ষেত্রেই বিষয়টি উপেক্ষা করছেন। এ অবস্থায় মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য উপজেলা ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, পিটিআই সুপারিন্টেডেন্ট, সহকারী সুপারিন্টেডেন্ট, ইন্সট্রাক্টর ক্ষেত্রবিশেষে সব ধরনের প্রশিক্ষণ মূল্যায়ন করবেন। প্রশিক্ষণ দিতে ব্যর্থ হলে বা প্রশিক্ষণ গ্রহণে ব্যর্থ হলে বিভাগীয় শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে কোন ধরনের শিথিলতা ও সহমর্মিতা দেখালে শৃঙ্খলা পরিপন্থী বলে বিবেচিত হবে। এছাড়া প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা শ্রেণিকক্ষে পাঠদানকালে যথাযথ প্রয়োগ না হলে একই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে সরকারের ব্যয়িত অর্থ ফেরত দিতে হবে।
মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে বার্ষিক পাঠ পরিকল্পনা, দৈনিক পাঠ পরিকল্পনা ও পাঠ উপকরণ নিয়ে পঠন প্রক্রিয়াকে কার্যকর ও আকর্ষণীয় করে তোলা শিক্ষকদের দায়িত্ব। এছাড়া শিক্ষার্থীদের স্কুলে আসার জন্য আগ্রহী করতে এবং শ্রেণিকক্ষে ধরে রাখতে স্কুলের আনন্দঘন সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করা আবশ্যক। এসব কাজে সরকার অর্থ বরাদ্দ করলেও বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী অনেক শিক্ষক তা করছেন না। বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে স্কুল পরিদর্শন কর্মকর্তাদের যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে। এজন্য প্রধান শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হলো।  
প্রাথমিক শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ দীর্ঘদিন খরচ হচ্ছে না। নির্ধারিত সময়ে কাজ হচ্ছে না। অর্থ ব্যয়ের কোন স্বচ্ছতা নেই। গুরুতর আর্থিক অনিয়ম হচ্ছে। যে কারণে স্কুলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসছে না। ভবিষ্যতে কোন ধরনের অনিয়ম হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
জরাজীর্ণ স্কুল ভবন, শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ, সীমানা প্রাচীর নির্মাণের প্রস্তাব প্রেরণকালে প্রকৃত চাহিদা পাঠানো হচ্ছে না। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলীর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের বিপত্তি ঘটছে। অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয়ও অনেক ক্ষেত্রে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
কেবল মানসম্মত শিক্ষা বা উন্নততর অবকাঠামো নির্মাণই যথেষ্ট নয়। শিক্ষার্থীদের আগামীদিনের জন্য সৎ, দক্ষ, দেশপ্রেমিক ও উদার মানবিক গুণাবলি সম্পন্ন অসাম্প্রদায়িক সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষকদের দায়িত্ব নিতে হবে। এজন্য ডিপিই থেকে জারি করা পরিপত্র ও নির্দেশনা অনুযায়ী নিয়মিত সমাবেশ, শিক্ষার্থীদের শপথ পাঠ করানো, জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া, জাতীয় পতাকার প্রতি সম্মান প্রদর্শনে উদ্বুদ্ধ করা, নির্ধারিত পাঠের বাইরে ক্রীড়া ও বিতর্ক প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন, জাতীয় দিবস উদযাপন, বইপড়া প্রতিযোগিতা, মা দিবস আয়োজনসহ নানা কর্মসূচি পালনে শিশুদের মানবিক বিকাশের মাধ্যমে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। প্রধান শিক্ষকদের বিদ্যালয়ে ক্ষুদে লাইব্রেরি, বুক কর্নার স্থাপন করতে হবে। একেক জন শিক্ষককে এ দায়িত্ব দিতে হবে। প্রধান শিক্ষককে তা আদায় করতে হবে। সর্বোপরি মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষাসহ প্রাথমিক শিক্ষার সার্বিক উন্নয়নে প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষকসহ মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আগের চেয়ে তৎপর হতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ নির্দেশনা প্রাথমিক শিক্ষার সব বিভাগীয় উপ-পরিচালক, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, পিটিআই সুপারিনটেন্ডেন্ট, সহকারী সুপারিনটেন্ডেন্ট, উপজেলা ও থানা শিক্ষা কর্মকর্তা, পিটিআই ইন্সট্রাক্টর, সহকারী উপজেলা ও থানা শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা ও থানা রিসোর্স সেন্টারের সহকারী ইন্সট্রাক্টর, প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক বরাবর পাঠানো হয়েছে।
Share on Google Plus

About Nejam Kutubi

    Blogger Comment
    Facebook Comment

0 comments:

Post a Comment