সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্র by ড. মোহাম্মদ সানাউল্লাহ্



বর্তমান বিশ্বে সংবাদপত্র একটি জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ গণমাধ্যম। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে এটি একটি স্বাধীন গণমাধ্যম। জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও চলমান বিষয়াবলির তথ্য নিয়ে প্রকাশিত পত্র-পত্রিকাকে সংবাদপত্র বলে। অজানাকে জানার কৌতুহল ও তথ্য সংগ্রহের প্রবণতার কারণেই মানুষ সংবাদপত্রের উদ্ভব ঘটিয়েছে। জনমত গঠনে, সামাজিক দায়িত্ব পালনে, জ্ঞানের বিকাশ সাধনে এবং শিক্ষার বিবরণে এটি আধুনিক বিশ্বে মানব জীবনের এক অপরিহার্য অঙ্গ। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণকে গণতন্ত্র চর্চায় উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রয়েছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে জনমতের গুরুত্ব সর্বাধিক এবং এই জনমত গঠনের একটি অন্যতম প্রধান মাধ্যম সংবাদপত্র। তাই বলতেই হয়, সত্য ও সঠিক সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে যে কোন দেশ কিংবা জাতির উন্নতি ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে সংবাদপত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিষয়বস্তুর ব্যাপকতা ও বৈচিত্র্যের কারণে সমগ্র বিশ্বে কোথায় কী ঘটছে-তা যেমন সংবাদপত্র পাঠের মাধ্যমে জানা যায়, তেমনি সমগ্র বিশ্বের মানুষের চিন্তা-চেতনার সঙ্গেও পরিচিত হওয়া যায়। এছাড়াও, জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা কথা, দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ, সাহিত্য ও সংস্কৃতি, ধর্ম, খেলাধুলা, চাকরির খবর, নিখোঁজ সংবাদ ইত্যাদি বিষয়ও সংবাদপত্রের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি। উনিশ শতকের বাংলায় যে নব জাগরণের সূচনা হয়েছিল, তাতে সংবাদপত্রের অসামান্য ভূমিকা ছিল। এটি পাঠ করেই মানুষ বুঝতে পেরেছিল দেশে নারী শিক্ষা প্রসারের প্রয়োজনীয়তা, মানব সমাজে বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর দিক, বিধবা বিবাহের ধর্মীয় ও বাস্তবসম্মত যৌক্তিকতা এবং জ্ঞান ও শিক্ষার প্রসারের পথে অন্ধ ধর্মচেতনার প্রতিবন্ধকতা। সমাজ পরিবর্তনের মর্মবাণী উপলব্ধি করার কারণে সংবাদপত্র পাঠকদের এই চিন্তা-চেতনা নতুন সমাজ গঠনের ক্ষেত্রে তাঁদেরকে উজ্জীবিত করে। বর্তমান বিশ্বে সবধরনের সংবাদপত্রে শিক্ষা বিভাগ চালু থাকায় শিক্ষার্থীরা শিক্ষা ও জ্ঞানলাভের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সুবিধাভোগ করছে, ফলশ্রুতিতে শিক্ষার প্রতি তাদের আগ্রহ বেড়েছে।
সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা। মানব সভ্যতার বিকাশে এর অসামান্য অবদান রয়েছে। এদেশের মহান স্বাধীনতা ও বিজয় অর্জনেও রয়েছে এর তাৎপর্যপূর্ণ ভ‚মিকা। ইংরেজ বিরোধী প্রতিটি আন্দোলনসহ ভাষা আন্দোলন এবং রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠা লাভ, চুয়ান্ন-এর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন ও বিজয় লাভ, ছেষট্টি-এর ছয়দফা কর্মসুচির বিপুল জনপ্রিয়তা, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মহাসাফল্য, ৭০-এর নির্বাচন এবং আওয়ামীলীগের দুর্দান্ত বিজয়, ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতা ও বিজয় লাভ-প্রতিটি সাফল্যের পেছনেই রয়েছে সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্রের অনস্বীকার্য অবদান। কিন্তু সাংবাদিকতার একটি ব্যক্তিত্ব আছে, আছে সত্যানুসন্ধানী চোখ, গণতন্ত্র ও মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, অকৃত্রিম দেশাত্মবোধ এবং চোখে পড়ার মতো ভাবগাম্ভীর্য। সাহিত্যকে যদি বলা হয় সমাজ দর্পণ, তবে সংবাদপত্রকে বলতে হবে ‘বিশ্ব দর্পণ, কেননা, এর মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বের সাথে আমাদের পরিচয় ঘটে। সংবাদপত্রের মাধ্যমে প্রকাশিত ‘সমগ্র বিশ্ব’ আমাদের সা¤প্রতিক বিশ্ব বলে অনেকেই সংবাদপত্রকে ‘চলন্ত ইতিহাস’ নামে অভিহিত করে। সংবাদপত্রের উপরোলিøখিত গুণাবলি বিদ্যমান থাকলেও এটাও সত্য যে, সংবাদ বা প্রতিবেদন রচনার ক্ষেত্রে অবশ্যই কিছু নিয়ম-বিধি আছে আর এই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটলে সংবাদপত্র চরিত্রভ্রষ্ট হয়। এ ধরনের সাংবাদিকতা হলুদ সাংবাদিকতারই নামান্তর, তাই শুধুমাত্র মানবকল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যেই যেন সংবাদপত্র ‘লোক-শিক্ষক’- এর মতো ভ‚মিকা পালন করতে পারে, সেদিকে খেয়াল রেখে আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য মালিক, সাংবাদিক, সরকার সকলকে  উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।
পেশাজীবি হিসেবে একজন সাংবাদিকের প্রধান কাজই হচ্ছে সাংবাদিকতায় সহযোগিতা করা। বিভিন্ন বয়সের পুরুষ কিংবা নারী সাংবাদিকতাকে অন্যতম মর্যাদাসম্পন্ন পেশা হিসেবে বেছে নেন। একজন সাংবাদিক যে কোন দেশে প্রতিবেদক হিসেবেও চিহ্নিত হয়ে থাকেন এবং গবেষণালব্ধ তথ্যের সাহায্যে প্রতিবেদন রচনা করে গণমাধ্যমে উপস্থাপন করেন। মুদ্রিত মাধ্যম হিসেবে সাময়িকী ও সংবাদপত্র, ইলেকট্রনিক মাধ্যম হিসেবে রেডিও, টেলিভিশন ও প্রামাণ্য চিত্র এবং ডিজিটাল মাধ্যম হিসেবে অনলাইন সাংবাদিকতায় নিজস্ব সংবাদ প্রচার কিংবা নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে তিনি নিরপেÿভাবে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। একজন প্রতিবেদক দেশের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র গন্ডি কিংবা আঞ্চলিক পর্যায় থেকে প্রাপ্ত তথ্যের মূল উৎস অনুসন্ধান করেন, বাস্তব অনুসন্ধানের প্রয়োজনে সাক্ষাতকার পর্বের আয়োজন করেন, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় সংশ্লিষ্ট থাকেন এবং সবদিক নিশ্চিন্ত হয়ে প্রতিবেদন প্রণয়নে অগ্রগামী হন। বস্তুত একটি যথার্থ প্রতিবেদন এভাবেই প্রণীত হয়ে থাকে।
হলুদ সাংবাদিকতা বলতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বানোয়াট ও ভিত্তিহীন রোমাঞ্চকর সংবাদ পরিবেশনকে বোঝায়। এ ধরনের সাংবাদিকতায় সত্য-মিথ্যা যাচাই না করেই দৃষ্টি আকর্ষণকারী শিরোনাম দিয়ে সংবাদ পরিবেশন করা হয়। হলুদ সাংবাদিকতার প্রকৃত উদ্দেশ্য হল সাংবাদিকতার নিয়ম-কানুন অবজ্ঞা করে পত্রিকার কাটতি বাড়ানো কিংবা টেলিভিশন চ্যানেলের দর্শক বাড়ানো। এক কথায় বলা যায়, হলুদ সাংবাদিকতা মানেই ভিত্তিহীন ও বানোয়াট সংবাদ পরিবেশন, দৃষ্টি আকর্ষণকারী শিরোনাম ব্যবহার, সাধারণ ঘটনাকে সাংঘাতিক ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার অপপ্রয়াস এবং ভালো মানের খবরের পরিবর্তে কেলেংকারির খবর গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ।
পরিশেষে বলবো, সংবাদপত্র একটি স্বাধীন ও গুরুত্বপূর্ণ গণমাধ্যম। এটি একটি দেশের উন্নতি, অবনতি কিংবা জনমত গঠনের প্রধান হাতিয়ার। জাতির উন্নতির জন্য সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও অর্থবহ গণতন্ত্রের চর্চা-উভয়ই প্রয়োজন। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার যাতে অপপ্রয়োগ না ঘটে এবং জনগণের গণতান্ত্রিক মানসিকতায় ভাঙ্গন ধরার মতো প্রতিবেদন যাতে প্রকাশিত না হয়-সেদিকে অবশ্যই আমাদের সকলের সজাগ দৃষ্টি রাখা উচিত। দেশ ও জাতির কল্যাণ সাধনই যদি সংবাদপত্রের প্রকৃত উদ্দেশ্য হয়, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র একযোগে সার্থকতা লাভ করার ÿেত্রে ভবিষ্যতে কোন প্রতিবন্ধকতাই থাকবে না।

ড. মোহাম্মদ সানাউল্লাহ্
অধ্যক্ষ্য, মেরন সান স্কুল এন্ড কলেজ,
চেয়ারম্যান, মেরিট বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন,
নির্বাহী সভাপতি, সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন, চট্টগ্রাম মহানগর,
Share on Google Plus

About Nejam Kutubi

    Blogger Comment
    Facebook Comment

0 comments:

Post a Comment