অবরুদ্ধ ‘শিববাড়ি’ by ওয়েছ খছরু

গুলির শব্দে প্রকম্পিত চারদিক। বাতাসে বারুদের গন্ধও। জঙ্গিদের ছোড়া গ্রেনেডে ধোঁয়া উড়ছে ‘শিববাড়ি’র আকাশে। বাসাবাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে লোকজন। উদ্বেগ আতঙ্কের অন্ত নেই স্থানীয় বাসিন্দাদের। অনেকেই চলে গেছেন বাড়ি ছেড়ে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের সরিয়ে  নেয়া হয়েছে। রোগীদেরও অন্যত্র নেয়া হয়েছে। অনেক বাড়িতেই এখন কেবল চরম আতঙ্কের মধ্যে পুরুষরা বসবাস করছেন। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, শুক্রবার ভোররাত থেকেই তাদের দুর্গতি শুরু। জঙ্গি আস্তানা চিহ্নিত হওয়ার পর বদলে গেছে শিববাড়ির দৃশ্যপট। জনাকীর্ণ এলাকা শিববাড়ি। স্থানীয় পয়েন্টে রয়েছে বাজার। সিলেট-ফেঞ্চুগঞ্জ সড়কের দক্ষিণ অংশে অর্ধশতাধিক দোকান রয়েছে ওই পয়েন্টে। উত্তর অংশেও রয়েছে অর্ধশতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। অভিযানের শুরু থেকে শিববাড়ি বাজার দখলে নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ কারণে শুক্রবার সকাল থেকেই দোকানপাট বন্ধ। ব্যবসায়ীরাও আতঙ্কের কারণে আসছেন না। শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত শিবমন্দিরের রাস্তাটির দোকানপাট খোলা ছিল। পরে নিরাপত্তাজনিত কারণে সেটিও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। শনিবার শিববাড়ি পয়েন্টে স্থানীয়দের উদ্যোগে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন ছিল। সেটিও আর করা হয়নি। শিববাড়ির পাশেই রয়েছে শিববাড়ি গ্রাম। যে গ্রামটির ৫ তলা ‘আতিয়া মহল’-এ হচ্ছে জঙ্গি অভিযান। ভবনের পাশেই রয়েছে বহুতল আরো ৪-৫টি ভবন। এই আবাসিক ভবনে বাসিন্দারা বসবাস করেন। এর মধ্যে পুলিশ কর্মকর্তা, সাংবাদিক সহ বিভিন্ন কলেজ ও স্কুলের শিক্ষকরা বসবাস করেন। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, শুক্রবার ভোররাতে অভিযান শুরুর দিনই শিববাড়ি পয়েন্টে থাকা আবাসিক বাড়িঘর খালি করে দেয়া হয়। সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষতি এড়াতে পুলিশের পক্ষ থেকেই তাদের সরিয়ে নেয়া হয়। তারা এখন বসবাস করছে আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে। ওই দিন বিকালে খালি করে দেয়া হয় আতিয়ার মহলের পাশের চতুর্থ তলার ভবনটি। কয়েকটি বাসা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে দেয়ার পর পুলিশ চতুর্দিকে ব্যারিকেড দেয়। এর মধ্যে মূল রাস্তার পাশেই ব্যারিকেড দেয়া হয়। আর পেছন দিকে স্কুলের ফটকের সামনে ব্যারিকেড বসায়। কিন্তু শনিবার সকাল থেকে ব্যারিকেডের ভেতরের অংশ চলে গেছে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা অবস্থান করছেন ব্যারিকেডের বাইরে। এছাড়া, কদমতলী এলাকায় পুলিশ একটি ব্যারিকেড দিয়েছে। সিলেট-ফেঞ্চুগঞ্জ সড়কে শনিবার সকাল থেকে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। শিববাড়ির পাশে রয়েছে কয়েকটি গ্রাম। এগুলোর মধ্যে রয়েছে পাঠানপাড়া, জৈনপুর, বান্দরঘাট, পদ্মপাড়া। এই চারটি গ্রামের মানুষ অভিযানের কারণে পুরোপুরি অবরুদ্ধ রয়েছে। গতকাল এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, শুক্রবার থেকে মুহূর্তে মুহূর্তে গুলির লড়াইয়ের কারণে গোটা এলাকায়ই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। শুক্রবার থেকে গতকাল পর্যন্ত হাজারেরও বেশি বাসিন্দা বাড়িঘর ছেড়ে আত্মীয়স্বজনের বাসায় চলে গেছেন। এর মধ্যে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও স্বাভাবিক হয়নি। অধিকাংশ সময় বিদ্যুৎহীন থাকে এলাকা। এ কারণে বাসাবাড়িতে তীব্র পানি সংকট দেখা দিয়েছে। গ্যাস সংযোগ বন্ধ রয়েছে তিন ধরে। ফলে রান্না করে খাওয়ার ব্যবস্থা নেই এলাকায়। যারা রয়েছেন তারা মাটির চুলা কিংবা গ্যাস স্টোভে রান্না সারছেন। অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগের অন্ত নেই। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা স্থানীয় লোকজনের যাতে দুর্ভোগ না হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখছেন। পাঠানপাড়া গ্রামের সোহেল আহমদ জানিয়েছেন, অপারেশনের পর থেকে গুলি ও গ্রেনেডের শব্দে পুরো এলাকা প্রকম্পিত হয়ে উঠেছে। এ কারণে অনেকেই বাড়িঘর ছেড়ে চলে গেছেন।
আতঙ্কের কারণেই তারা বাড়িঘর ছেড়ে চলে গেছেন বলে জানান তিনি। স্থানীয়রা জানান, শিববাড়ি সহ ৫টি গ্রামের মানুষ ঘরবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। ভয়ে তারা বাড়ি থেকে বের হচ্ছে না। গত শনিবার বিকাল থেকেও এই আতঙ্ক তাদের বেড়েছে। এর কারণ ইতিমধ্যে খবর রটেছে আস্তানার আশেপাশে অবস্থান করছে জঙ্গিরা। ফলে তারাও হামলার মুখে পড়তে পারেন বলে জানান। শিববাড়ি এলাকার অনু বিশ্বাস জানিয়েছেন, এলাকার লোকজন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আচরণে সন্তুষ্ট। কিন্তু অপারেশনের কারণে গোটা এলাকার জীবনযাত্রা থমকে গেছে। জঙ্গি আস্তানার পাশের বাড়িঘরের মানুষরা দূরে সরে গেছেন। আর যারা রয়েছেন তারা অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে বলে জানান তিনি। আর  দোকানপাট বন্ধ থাকায় ওই এলাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যেরও সংকট হচ্ছে বলে জানান তিনি। বন্দরঘাটের ময়না মিয়া জানিয়েছেন, দিনে ও রাতে ঘুমানো যায় না। অভিযানের কারণে গুলির শব্দ হচ্ছে এলাকায়। মানুষ নিরাপত্তাহীন। বলা যায় না কখন কী ঘটে। এ কারণে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে এলাকার মানুষ। এই দুর্গতিতে পড়েছেন কদমতলী থেকে শিববাড়ি পর্যন্ত এলাকার বাসিন্দারাও। গোটা রাস্তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দখলে নেয়ার কারণে তারাও দুর্ভোগে রয়েছে। শিববাড়ি এলাকায় কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কোচিং সেন্টার রয়েছে। ঘটনার প্রথম দিন থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে পড়েছে বলে জানান এলাকার মানুষ।
Share on Google Plus

About বাংলা খবর

    Blogger Comment
    Facebook Comment

0 comments:

Post a Comment