ইতিহাসের হাতছানি by মান্না চৌধুরী



ইতিহাসের হাতছানি। প্রস্তুত বাংলাদেশ। ক্রিকেট ভালোবাসুক আর না বাসুক সব বাংলাদেশির চোখ কলম্বোর দিকে। দেশবাসীকে আরো একবার আনন্দে মাতাতে পারেন সাকিব-মুশফিকরা। শততম টেস্টে জয়ের চেয়ে উদযাপনের বড় উপলক্ষ আর কী হতে পারে? টেস্ট খেলুড়ে নয়টি দেশের মধ্যে এর আগে নিজেদের শততম টেস্টে জয়ের স্বাদ পেয়েছে কেবল তিন দেশ- অস্ট্রেলিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর পাকিস্তান। হেরেছে পাঁচ দেশ। ড্র করে মান রক্ষা করেছে নিউজিল্যান্ড। কলম্বোর পি সারা স্টেডিয়ামে ম্যাচের লাগামটা বাংলাদেশের হাতেই রয়েছে। এখন পর্যন্ত আগের টেস্টে অসহায় হারের পর মাইলফলকের টেস্টে চতুর্থদিন পর্যন্ত শক্ত অবস্থানে বাংলাদেশই।
সংশয় আর শঙ্কা বাংলাদেশ দলকে নিয়ে যতই থাকুক জয়ের সম্ভাবনাটা এখন পর্যন্ত খুবই উজ্জ্বল। নিজেদের ডেরাতেই বাঘের থাবায় কাবু সিংহ। আক্রমণ নয়, পালানোর পথ খুঁজছে স্বাগতিকরা। তবে সিংহ বলে কথা! একেবারে উড়িয়ে দেয়াও যায় না। ঘুরে দাঁড়াতে না পারলেও কাল জায়গায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সব আক্রমণ ঠেকিয়ে নিজেদের অনেকটা গুছিয়ে নিয়েছেন লঙ্কান ব্যাটসম্যানরা। প্রথম ইনিংসের মতো দ্বিতীয় ইনিংসেও শেষের ব্যাটসম্যানরা তাদের কারিশমা দেখিয়ে চলেছেন। আজ সকালটা বাংলাদেশের বোলারদের রক্তচক্ষু কতটা সামলে উঠতে পারে শ্রীলঙ্কা তার ওপরই নির্ভর করছে ম্যাচের ভাগ্য। আজ যদি মধ্যাহ্ন বিরতির আগ পর্যন্তও তারা ইনিংসটাকে টেনে নিতে পারে তবে বাংলাদেশের সামনে খুব বেশি হলে ২০০ রানের লক্ষ্য দাঁড়াবে। দিনের অবশিষ্ট ৬০ ওভারে (কমপক্ষে, যদি বৃষ্টি বা অন্য কোনো কারণে খেলা বন্ধ না হয়) এ মাঠে চতুর্থ ইনিংসে এ লক্ষ্যটা খুব সহজেই টপকে যাওয়ার মতো। পরিসংখ্যান বলছে এ মাঠে সর্বনিম্ন ২৪৪ রানের লক্ষ্য দিয়ে জয় পেয়েছে শ্রীলঙ্কা। এর চেয়ে কম রানের পুঁজিতে জিততে পারেনি তারা। তাই খুব শোচনীয় কিছু না ঘটলে উল্লাসের জন্য প্রস্তুত থাকতে পারেন আপনিও।
লঙ্কানরা চতুর্থদিন শেষে ১৩৯ রানে এগিয়ে। ১৭৭ রানে ৫ উইকেট পতনের পর লঙ্কানরা যেভাবে পরিস্থিতি সামলে ওঠে তা শিক্ষণীয়। লাঞ্চের পর শ্রীলঙ্কা দ্রুত তিন উইকেট হারালেও একপ্রান্তে ঠিকই অবিচল ছিলেন করুণারত্নে। সপ্তম উইকেটে তার সঙ্গে জুটি বেঁধে অসামান্য এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন দিলরুয়ান পেরেরা। তিনি শেষ পর্যন্ত অপরাজিত আছেন ১২৬ বলের মোকাবিলায় ২৬ রান করে। ১০০ বলের মধ্যে কোনো চার ছিল না। মিরাজের বলে সৌভাগ্যক্রমে দু’টি চার পেয়ে রান তার কুড়ি পেরোয়।  ১২৬ রান করে যখন আরো বড় কিছুর স্বপ্ন দেখছেন তখনই সাকিবের দুর্দান্ত এক ডেলিভারি। করুণারত্নের ব্যাট ছুঁয়ে স্লিপে দাঁড়ানো সৌম্যর হাতে জমা পড়ে ক্যাচ। ২১ ওভার স্থায়ী সপ্তম উইকেটে রান ওঠে মাত্র ২৭। এরপর হেরাথ আর দিলরুয়ান উইকেটে দাঁড়িয়ে গেলে তাইজুল এসে ভাঙেন জুটি হেরাথকে আউট করে। তবে দিনের একেবারে শেষভাগে নবম উইকেটে লাকমল আর দিলরুয়ান দাঁড়িয়ে যান। অবিচ্ছিন্ন ৩০ রান তুলে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন শ্রীলঙ্কাকে। দিনশেষে শ্রীলঙ্কা দ্বিতীয় ইনিংসে ১০০ ওভারে ৮ উইকেটে করেছে ২৬৮ রান।
মোস্তাফিজের যেমন ফর্মে ফেরার তাড়না ছিল তেমনি দিমুথ করুণারত্নেরও। দু’জনই ফিরলেন ঠিক সময়ে তবে মুখোমুখি লড়াইয়ে করুণাই থাকলেন এগিয়ে। শ্রীলঙ্কান ব্যাটসম্যান সেঞ্চুরি করে যেন ফিরে পেলেন নতুন জীবন। ১১ ইনিংস পর টেস্টে ফিফটি। শেষ ১০ ইনিংসে ব্যাটিং গড় ছিল ১১! করুণারত্নের টেস্ট ক্যারিয়ার টিকে রইলো বাংলাদেশকে হতাশার সাগরে ভাসিয়ে। ক্যারিয়ারের ৫ম সেঞ্চুরি করে যখন বিদায় নেন তার নামের পাশে ১২৬ রান। ৩৫০ মিনিট উইকেটে থেকে বল খেলেছেন ২৪৪টি।
কলম্বো টেস্টের চতুর্থদিন সকাল থেকেই পি সারার উইকেটে করুণারত্নে আর কুশল মেন্ডিসের জমাট  জুটি। প্রথম সেশনটা নির্বিঘ্নেই কাটে শ্রীলঙ্কার, ১ উইকেটে ১৩৭ রান। বাংলাদেশ শিবিরে শঙ্কা জেগে উঠেছিলো, শততম টেস্টটা তাহলে চলে যাচ্ছে শ্রীলঙ্কার পক্ষে। মধ্যাহ্ন বিরতিতে নিশ্চয় এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বাংলাদেশ ড্রেসিংরুমে। হাতুরুসিংহে কী এমন মন্ত্র দিলেন যে, ফিরে এসেই অন্য চেহারায় বাংলাদেশের বোলিং। ১ উইকেটে ১৩৭ থেকে ৬ উইকেটে ১৯০ শ্রীলঙ্কা! মোস্তাফিজের নামের পাশে ৩ উইকেট, সাকিবের ২টি।
করুণারত্নে আর কুশল মেন্ডিসের জমে যাওয়া জুটি মোস্তাফিজ ভাঙতেই বাংলাদেশ যেন জ্বলে ওঠে। ইনজুরি আর ফর্মের সঙ্গে অনেকদিনের লড়াই মোস্তাফিজের। শ্রীলঙ্কায় এসেও ভাঙতে পারেননি ফর্মের বৃত্ত। গল টেস্টের পর কলম্বো টেস্টের প্রথম ইনিংসেও অনুজ্জ্বল কাটার মাস্টার। সেই হতাশা কাটিয়ে জ্বলে উঠতে সময় নিলেন মাত্র ১০ ওভার। শ্রীলঙ্কা ইনিংসের ৪৫ ওভারের শেষ বলে মেন্ডিসকে দিয়ে শুরু, শেষ করলেন ৫৫ ওভারের শেষ বলে ধনঞ্জয় ডি. সিলভাকে আউট করে। এই দু’টির মাঝখানে নিয়েছেন প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করা দিনেশ চাণ্ডীমালের উইকেটও। আবার সবক’টি আউটের ধরনও একই রকম। মোস্তাফিজের বল মেন্ডিস, চাণ্ডীমাল আর ডি. সিলভার ব্যাটের কোণা ছুঁয়ে যায় উইকেটের পেছনে, তিনটি ক্যাচই নেন মুশফিক! এরপর নায়কের ভূমিকায় আগের দিনের ব্যাটিং হিরো সাকিব। ৫ রান করা ডিকওয়েলাকে মুশফিকের ক্যাচ বানানোর পর সবচেয়ে বড় কাজটি করেছেন করুণারত্নের উইকেট নিয়ে।
Share on Google Plus

About Nejam Kutubi

    Blogger Comment
    Facebook Comment

0 comments:

Post a Comment