জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান -ফরিদপুরে প্রধানমন্ত্রী

মাহবুবুল ইসলাম পিকুল, মানবজমিন ফরিদপুরঃ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ এবং মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ছাত্র-ছাত্রীদের জঙ্গি, মাদকাসক্তি এবং সন্ত্রাসের পথ পরিহার করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী গতকাল ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ মাঠে জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের অভিভাবকবৃন্দ, শিক্ষক, মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন, ওলামা-মাশায়েখ, বিভিন্ন পেশাজীবী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, প্রশাসনসহ সকলের কাছে আমার এই আহ্বান থাকবে- একটা ছেলে-মেয়েও যেন ওই সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ এবং মাদকের পথে না যায়। যে কোনো স্কুল-কলেজের ছেলে-মেয়ের অনুপস্থিতির হিসাব নিতে হবে। বাবা-মা’কে, নিজের ছেলে-মেয়ে কার সঙ্গে মিশে, কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করে, কার সঙ্গে চলাফেরা করে তা খেয়াল রাখতে হবে। তিনি বলেন, ইসলাম শান্তির ধর্ম, ইসলাম ধর্ম মানুষকে হত্যা করতে বলে নাই। ইসলাম ভ্রাতৃত্বের ধর্ম, সৌহার্দ্যের ধর্ম, আমাদের নবী করিম (সাঃ) আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন যে, যে ধর্মেরই হোক সকলকে সহযোগিতা করতে। নিরীহ মানুষকে হত্যা করা আর আত্মহননের পথ বেছে নেয়া কখনো ইসলাম সমর্থন করে না। জনসভায় অংশ নেয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ২০টি প্রকল্পের উদ্বোধন এবং আরো ১২টি নতুন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। প্রধানমন্ত্রী আসন্ন ২০১৯ সালের নির্বাচনে নৌকার জন্য ফরিদপুরবাসীর কাছে ভোট চেয়ে তিনি বলেন, এই এলাকায় যখনই আপনারা নৌকায় ভোট দিয়েছেন তখনই আপনাদের উন্নতি হয়েছে। কাজেই আমি আপনাদের কাছে ওয়াদা চাই- আগামী নির্বাচন সামনে, ২০১৯ সালে নির্বাচন হবে। সেই নির্বাচনে আমাদের উন্নয়নের কাজ যেন অব্যাহত রাখতে পারি তার জন্য নৌকা মার্কায় আপনাদের ভোট চাই। প্রধানমন্ত্রী ঢাকা বিভাগকে ভেঙে ফরিদপুরসহ ৫টি জেলা নিয়ে পৃথক একটি বিভাগ গঠনে সরকারের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ্‌ ঢাকা বিভাগ ভেঙে আমরা নতুন আরেকটা বিভাগ করবো। ফরিদপুর, মাদারীপুর, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জ নিয়ে আরেকটি বিভাগ আমরা করবো সেই পরিকল্পনাও আমাদের রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের এই বিভাগ করার উদ্দেশ্য জনগণ যাতে বেশি সেবা পায়। জনগণ যাতে আরো বেশি কাজ পায় সেই সুযোগ আমরা সৃষ্টি করে দিচ্ছি। দক্ষিণাঞ্চল এবং পদ্মাপাড়ের মানুষ চিরদিন অবহেলিত ছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্মাণাধীন পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হলে এই অঞ্চলের জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এডভোকেট সুবল চন্দ্র সাহা জনসভায় সভাপতিত্ব করেন এবং আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক আবদুর রহমান সভা পরিচালনা করেন। বক্তৃতা করেন- আওয়ামী লীগের  প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং জাতীয় সংসদের উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, দলের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, প্রেসিডিয়াম সদস্য এলজিআরডি মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন, কাজী জাফর উল্লাহ এবং লে. কর্নেল (অব:) ফারুক খান, নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানসহ আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। সভায় প্রধানমন্ত্রীর জামাতা খন্দকার মাশরুর হোসেন মিতুকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। অনুষ্ঠানে মন্ত্রী পরিষদ সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাবৃন্দ, জাতীয় সংসদ সদস্যবৃন্দ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এবং সুধী সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে ফরিদপুর জেলা শহর ও সমাবেশস্থল উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়। তোরণ, রঙ-বেরঙের ব্যানার, ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু এবং প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন রকম প্রতিকৃতিতে বর্ণিল হয়ে ওঠে পুরো শহর এবং সমাবেশ এলাকা। হাজার হাজার মানুষ সকাল থেকে নেচে-গেয়ে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজেন্দ্র কলেজ মাঠের সমাবেশে এসে যোগ দেয়।
প্রধানমন্ত্রী যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করেন সেগুলো হচ্ছে- ফরিদপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় নির্মাণ, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, পল্লীকবি জসীমউদ্‌দীন সংগ্রহশালা, ফরিদপুর ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজি, শিশু একাডেমি, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শকের কার্যালয় নির্মাণ, জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন, আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস ফরিদপুর, ফরিদপুর ৫০ মেগাওয়াট পিকিং পাওয়ার প্লান্ট, সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের একাডেমিক কাম পরীক্ষা হল নির্মাণ, সদর উপজেলাধীন চর কমলাপুর খেয়াঘাট থেকে বিলমামুদপুর স্কুল সড়কে কুমার নদীর ওপর ৯৬ মিটার আরসিসি ব্রিজ নির্মাণ, ভাঙ্গা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণ, মধুখালী উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সকে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নয়ন, আঞ্চলিক নির্বাচন অফিস ফরিদপুর, বিএসটিআই ভবন নির্মাণ, ভাঙ্গা থানা ভবন নির্মাণ, মধুখালী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন নির্মাণ, সদর উপজেলা থেকে বাখুণ্ডা জিসি হয়ে রসূলপুর ভায়া চরনিখুরদি সড়ক বিসি দ্বারা উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্প, ফরিদপুর সদর উপজেলাধীন ডিক্রিরচর ইউনিয়নের মুন্সীডাঙ্গী কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ এবং ৩৩/১১ কেভি হারুকান্দি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র (ক্ষমতা ২০/২৬.৬৬ এমভিএ)। এছাড়া, প্রধানমন্ত্রী কুমার নদ পুনঃখনন প্রকল্প, কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আলফাডাঙ্গা, ফরিদপুর পুলিশ সুপারের কার্যালয়, পুলিশ হাসপাতাল, পুলিশ অফিসার্স মেস, সালথা টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের একাডেমিক কাম প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ, চন্দ্রপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র, সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ ফরিদপুরের ছাত্রীনিবাস নির্মাণ, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত নির্মাণ, ১৫০০ আসন বিশিষ্ট মাল্টিপারপাস হলরুম নির্মাণ, সালথা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন, সদরপুর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
২০০১ সালে নির্বাচনের পর বিএনপি-জামায়াত ফরিদপুরে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সে সময় আওয়ামী কর্মী বাবুল মাতব্বর, মো. পাঞ্জু মোল্লা, টুকু মিয়া, সাহেদ আলী, ছাত্রলীগ নেতা বিশ্বজিৎ দাসগুপ্ত, শ্রমিক লীগ নেতা আমির আলী, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মনিরুজ্জামান ও তপন ভট্টাচার্যসহ অনেক নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়। তিনি বলেন, ২০১৩, ১৪ ও ১৫ সালেও বিএনপি বাংলার মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে। আন্দোলনের নামে তারা মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে। ৩ হাজার ৬০০ জনকে পুড়িয়ে দগ্ধ করেছে। ৩২৫২টি গাড়ি পুড়িয়েছে। তাদের হাত থেকে নারী-শিশু কেউই রক্ষা পায়নি। বায়তুল মোকাররমে পবিত্র কোরআন শরীফ পুড়িয়েছে তারা। বিএনপি’র রাজনীতি  পেট্রোল বোমা দিয়ে মানুষকে পুড়িয়ে হত্যার রাজনীতি। তাদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। প্রধানমন্ত্রী এ সময় তার সরকারের নেয়া বিভিন্ন প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে বলেন, গরিবের বন্ধু আওয়ামী লীগ। গরিবদের জন্য আওয়ামী লীগ কাজ করে যাচ্ছে। আমরা ৯৮ লাখ ৫৪ হাজার কৃষককে ১০ টাকায় ব্যাংক একাউন্ট  খোলার ব্যবস্থা করেছি। তিনি বলেন, ২ কোটি ৫ লাখ ৭৫ হাজার কৃষকের মাঝে কৃষি উপকরণ কার্ড বিতরণ, তিন দফায় সারের মূল্য হ্রাস, ১০ টাকা কেজি দরে মাসে ৩০ কেজি করে ৫০ লাখ দরিদ্র জনগণের মাঝে ন্যায্যমূল্যে চাল বিতরণ এবং ৪১ লাখ ১৩ হাজার স্বামী পরিত্যক্তা, বয়স্ক এবং বিধবার মাঝে মাসে ৪শ’ টাকা হারে ভাতা বিতরণ করছে সরকার। বিনামূল্যে বছরের প্রথমদিন বই বিতরণের অংশ হিসেবে তাঁর সরকার ইতিমধ্যে গত ৮ বছরে ২৪৩ কোটি বই বিতরণ করেছে। ডিগ্রি পর্যন্ত শিক্ষার্থী বৃত্তি- উপবৃত্তি প্রদান, ‘মায়ের হাসি’ প্রকল্পের মাধ্যমে ১ কোটি ৩০ লাখ মায়ের কাছে মাসের শুরুতেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সন্তানদের বৃত্তির টাকা পৌঁছে দেয়াসহ জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে সরকার সারাদেশে ১৬ হাজার ৪৩৮টি কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেছে। সেখান থেকে জনগণকে ৩০ প্রকারের ওষুধ বিনামূল্যে প্রদান করা হচ্ছে। দেশে ডিজিটাইজেশন করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন বাস্তব, সারা দেশে ৫ হাজার ২৭৫টি ডিজিটাল সেন্টার থেকে ২শ’ প্রকারের সেবা প্রদান করা হচ্ছে, মোবাইল সিম গ্রাহকের সংখ্যা ১৩ কোটিরও বেশি, ইন্টারনেট গ্রাহক ৫ কোটি, এখন ঘরে বসেই মানুষ ইন্টারনেটের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা এবং আউটসোর্সিয়ের মাধ্যমে টাকা রোজগার করতে পারছে। এ জন্য সরকারের একটি ‘লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং’ নামে প্রকল্প চালু আছে বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বিএনপি-জামায়াতের কাজই হলো ক্ষমতায় থেকে লুটপাট করা। আর ক্ষমতার বাইরে গেলে আগুনে মানুষ পুড়িয়ে হত্যা। তিনি বলেন, আমরা ২০২১ সালের মধ্যেই মধ্যম আয়ের বাংলাদেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধামুক্ত দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়ে তুলবো, ইনশাআল্লাহ্‌।
Share on Google Plus

About বাংলা খবর

    Blogger Comment
    Facebook Comment

0 comments:

Post a Comment