স্বাধীনতা দিবসে সমৃদ্ধ দেশ গড়ার প্রত্যয়

সমৃদ্ধ দেশ গড়ার শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে পালিত হলো মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের ৪৬তম বার্ষিকী। স্বাধীনতার এ দিনে জাতি বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করেছে স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী বীর সেনানীদের। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ভোরে সূর্য ওঠার আগে থেকেই লাল সবুজের পতাকা আর ফুল নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে আসা বিভিন্ন বয়সী ও শ্রেণি-পেশার মানুষের ভিড় জমতে শুরু করে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ এলাকায়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই জনস্রোতও বাড়তে থাকে। জাতীয় স্মৃতিসৌধের শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন ও শহীদদের স্মরণ করেন সর্বস্তরের মানুষ। একই সঙ্গে সবার মুখে মুখে উচ্চারিত হয় জঙ্গিবাদমুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়। গতকাল ভোরে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। ভোর ৬টায় সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ জাতীয় বীরদের প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী। প্রথমে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ও পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সশস্ত্রবাহিনীর একটি সুসজ্জিত দল এ সময় রাষ্ট্রীয় সালাম জানায়। একই সঙ্গে বিউগলে বাজানো হয় করুণ সুর। শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এ সময় মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, বিচারপতি, তিন বাহিনীর প্রধানসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এরপর জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। পরে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ সভাপতি হিসেবে দলের কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নিয়ে স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী স্মৃতিসৌধ ত্যাগ করার পর মুক্তিযোদ্ধা, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন, বিদেশি কূটনীতিকসহ সর্বস্তরের জনগণের শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব শুরু হয়।
সকালে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। বিএনপিকে জঙ্গিবাদের প্রধান ‘পৃষ্ঠপোষক’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, বিএনপি জঙ্গিদের মদত দিচ্ছে এবং পৃষ্ঠপোষকতা করছে। তা না হলে জঙ্গিদের এতটা আশকারা পাওয়ার কথা ছিল না। সাম্প্রদায়িক অপশক্তি ও স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রতিরোধের আহ্বান জানিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, আসুন সাম্প্রদায়িক অপশক্তি, স্বাধীনতার শত্রু এদের প্রতিরোধ ও পরাজিত করি। সকাল সাড়ে ৯টায় জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ শীর্ষ নেতাদের মধ্যে আবদুল মঈন খান, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, রুহুল কবির রিজভী, আমানউল্লাহ আমান, খায়রুল কবির খোকন এ সময় খালেদা জিয়ার সঙ্গে ছিলেন। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল সাংবাদিকদের বলেন, যে জন্য আমরা রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলাম, মানুষের সেই স্বাধীনতা ও ভোটের অধিকার আজ নেই। তিনি বলেন, আমরা শুরু থেকেই বলে আসছিলাম এ সমস্যাটি একটি জাতীয় সমস্যা। এটিকে মোকাবিলা করতে হলে দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, সাধারণ মানুষের কথা বলা, পাকিস্তানিরা যেভাবে গণতন্ত্র কেড়ে নিয়েছিল, সেভাবে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারও তা কেড়ে নিয়েছে। মানুষের জীবন আজ দুর্বিষহ। তিনি বলেন, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও গণতন্ত্র রক্ষায় যে অন্তর্নিহিত শক্তি নিয়ে আমরা যুদ্ধ করেছিলাম, দেশের সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা ও গণতন্ত্র রক্ষার সংগ্রামকে সেই অন্তর্নিহিত শক্তি দিয়েই এগিয়ে নিয়ে যাবো। পর্যায়ক্রমে জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় জাতীয় পার্টি, জাসদ, সিপিবি, ওয়ার্কার্স পার্টি, বাসদ, সাম্যবাদী দল, গণতন্ত্রী পার্টি, গণফোরাম, বাংলাদেশ জনসেবা পার্টি (বাজপা), ছাত্রলীগ, যুবলীগ, যুবদল, ছাত্রদল, যুব ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, জাসাস, মহিলা পরিষদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। এছাড়া সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, এনজিও প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পক্ষ থেকেও স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এদিকে দিবসটি উপলক্ষে যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে নেয়া হয় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। স্মৃতিসৌধ এলাকা ও এর আশপাশে বসানো হয় সিসিটিভি ক্যামেরা ও আর্চওয়ে। এছাড়া রাজধানীসহ সারা দেশেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়।
এদিকে গতকাল মহান স্বাধীনতা দিবস ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে  সকালে দলের পক্ষ থেকে ধানমন্ডিস্থ ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধু ভবনে স্থাপিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। এ সময় বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনে ও তার আশপাশের সড়কগুলোতে দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে এক উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকাল ৭টায় বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে তার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতির সামনে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এ সময় সেনাবাহিনীর একটি সুসজ্জিত চৌকস দল অভিবাদন জানায়। পরে আওয়ামী লীগ সভাপতি হিসেবে দলীয় নেতৃবৃন্দকে সঙ্গে নিয়ে দলের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ করেন শেখ হাসিনা। এ সময় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদসহ দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, প্রেসিডিয়াম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী, সাহারা খাতুন, আব্দুল মান্নান খান, আবদুর রাজ্জাক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, জাহাঙ্গীর কবির নানক,  গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, দপ্তর সম্পাদক আব্দুস সোবহান গোলাপসহ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির অন্যান্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমীন চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ উপলক্ষে গতকাল ভোর ৬টা থেকেই বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানাতে আওয়ামী লীগ ও এর বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন এবং বিভিন্ন বয়সী শ্রেণি-পেশার মানুষ বঙ্গবন্ধু ভবনের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তের সড়কে জমায়েত হতে থাকেন। এ সময় বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে উপস্থিত হাজারো জনতার ‘জয় বাংলা’ ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে পুরো এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগ সভাপতি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে ওই এলাকা চলে যাওয়ার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ  বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর ও দক্ষিণ, আওয়ামী যুবলীগ, আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, জাতীয় শ্রমিক লীগ, কৃষক লীগ, যুব মহিলা লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, তাঁতী লীগ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটসহ বিভিন্ন সংগঠনের সংগঠনের নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। জাতীয় এ দিবস উপলক্ষে রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বেসরকারি স্থাপনাসহ নগরীর প্রধান প্রধান সড়কগুলো সাজানো হয় আলোকসজ্জাসহ মনোরম সাজে। একই সঙ্গে ওড়ানো হয় জাতীয় পতাকা। এ ছাড়া সারা দেশের জেলা, উপজেলাগুলোতেও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের পাশাপাশি মনোরম সাজে সাজানো হয়। এ উপলক্ষে শহীদদের স্মরণে সারা দেশের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়।  দিনটির তাৎপর্য তুলে ধরে রাজধানীসহ সারা দেশে বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের বিভিন্ন দূতাবাসেও নানা কর্মসূচি পালিত হয়। এদিকে স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভা আজ বিকাল সাড়ে তিনটায় রাজধানীর খামারবাড়িস্থ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে অনুষ্ঠিত হবে। সভায় সভাপতিত্ব করবেন দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
Share on Google Plus

About বাংলা খবর

    Blogger Comment
    Facebook Comment

0 comments:

Post a Comment