র‌্যাব ক্যাম্পে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ যুবক নিহত, দেশজুড়ে অ্যালার্ট



রাজধানীর আশকোনায় হাজী ক্যাম্পের পাশে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) প্রস্তাবিত সদর দপ্তরের অস্থায়ী ব্যারাক এলাকায় ‘আত্মঘাতী’ বিস্ফোরণে এক যুবক নিহত হয়েছে। তার বয়স আনুমানিক ২৮-৩০ বছর। বোমার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে  যুবকের দেহ। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন ২ র‌্যাব সদস্য।
গতকাল দুপুর ১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। আহত দু’র‌্যাব সদস্যকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের অবস্থা শঙ্কামুক্ত বলে জানিয়েছেন র‌্যাবের পরিচালক (গণমাধ্যম) মুফতি মাহমুদ খান।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের দু’জঙ্গি আস্তানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পরদিনই আশকোনার এ ঘটনা ঘটলো। গতকালের ঘটনার ব্যাপারে মুফতি মাহমুদ খান সাংবাদিকদের বলেন, আশকোনার ওই কম্পাউন্ড র‌্যাব সদর দপ্তর নির্মাণের জন্য নির্ধারিত জায়গা। নির্মাণকর্মী ও তদারককারীরা ওই কম্পাউন্ডের ভেতরে অস্থায়ী ব্যারাকে থাকেন। সেখানে স্টোরও রয়েছে। পাশেই একটি জায়গা আছে, যেখানে তারা গোসল করা বা কাপড় ধোয়ার কাজও করেন। আর হাজী ক্যাম্প আর র‌্যাবের জায়গার মাঝখানে একটি রাস্তা রয়েছে। আনুমানিক দুপুর ১টার দিকে নামাজের আগে এক যুবক ওই রাস্তা ধরে আসে। গ্রিল ও দেয়ালে নির্মিত সীমানা প্রাচীর টপকে ওই অপরিচিত লোক ভেতরে ঢোকে। তখন র‌্যাব সদস্যরা তাকে চ্যালেঞ্জ করলে সে এস্কেপের (পালানোর) চেষ্টা করে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সে বিস্ফোরণ ঘটায়। তাতে তার মৃত্যু ও দু’র‌্যাব সদস্য আহত হন। তবে তারা শঙ্কামুক্ত।
এই হামলা কারা চালিয়ে থাকতে পারে জানতে চাইলে মুফতি মাহমুদ খান সাংবাদিকদের বলেন, এ বিষয়ে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে যেভাবে হামলা হয়েছে, তাতে ধারণা করা যায় যে, সে (হামলাকারী) জঙ্গিগোষ্ঠীর সদস্য। এ ঘটনার পর গতকাল দুপুরে বিস্ফোরণস্থলে ছুটে যান র‌্যাব ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ব্যারাকের বাইরে বাড়তে থাকে উৎসুক জনতার ভিড়। ব্যারাকের সামনে ঘটনাস্থল হলুদ ফিতা দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী মাছ ব্যবসায়ী মো. সেলিমুজ্জামান জানান, ঘটনার সময় মসজিদে জুমার খুতবা হচ্ছিল। তখন তিনি নামাজ পড়ার জন্য হাজী ক্যাম্পের পাশের মসজিদে যাচ্ছিলেন। তখন হঠাৎ করে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। তিনিসহ আরো প্রায় ১০ জন ব্যারাকের মূল গেট দিয়ে ঢুকে দেখেন যে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় এক যুবক পড়ে আছে। ব্যারাকের সামনের পান দোকানি মোস্তাফিজুর রহমান জানান, মূল গেটে সবসময় র‌্যাবের দুই সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে থাকেন। মূল গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলে তল্লাশির মুখোমুখি হতে হয়। তবে মূল গেটের পকেট গেটটি সবসময় খোলা থাকে। দেয়াল টপকে ছাড়া সামনের গেট দিয়ে প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই। তিনি জানান, বিস্ফোরণের শব্দ শুনে তারা প্রথমে মনে করেছেন ট্রাকের টায়ারের টিউব ফেটে আওয়াজ হয়েছে। পরে ব্যারাকের ভেতরে ঢুকে দেখেন যে, এক যুবক নিহত হয়েছে। তিনি আরো জানান, শুক্রবার ছুটি ও জুমার নামাজের সময় হওয়ায় রাস্তা ও আশপাশে মানুষ ছিল খুব কম।
বিমানবন্দর থানার ওসি নূরে আজম মিয়া সাংবাদিকদের জানান, হামলাকারী জঙ্গি বলে মনে হয়েছে। তার সঙ্গে আর কোনো যুবক রয়েছে কিনা তার জন্য আশপাশের এলাকায় অভিযান চলছে।
এর আগে গত বছরের জুলাইয়ে গুলশান ও শোলাকিয়ায় হামলার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক অভিযানের মধ্যে বেশ কিছুদিন পরিস্থিতি শান্ত থাকে। এরপর গত ৭ই মার্চ কুমিল্লায় একটি বাসে তল্লাশির সময় পুলিশের দিকে বোমা ছোঁড়ার পর ধরা পড়ে দুই জঙ্গি। তাদের মধ্যে একজনকে সঙ্গে নিয়ে ওই রাতেই মিরসরাইয়ের একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে অস্ত্র ও বোমা উদ্ধার করে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। এরপর বুধবার বিকালে সীতাকুণ্ডের এক বাড়ি থেকে বিস্ফোরকসহ এক জঙ্গি দম্পতিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে পাশের ওয়ার্ডে আরেক বাড়িতে দীর্ঘ ১৯ ঘণ্টা অভিযান চালায় পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট ও সোয়াট টিম। আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ও গুলিতে এক নারীসহ চার জঙ্গি নিহত হওয়ার মধ্যে দিয়ে সীতাকুণ্ড অভিযানের সমাপ্তি ঘটে।
সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্কতা
দেশে এই প্রথম আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্যাম্পে ‘আত্মঘাতী’ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনার পর থেকে পুলিশ ও র‌্যাবকে বিশেষ সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একইভাবে দেশের সকল বিমাবন্দর, লঞ্চঘাট ও কারাগারে সতর্কতা জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। গতকাল বেলা ১টার পর জুমার নামাজের ঠিক আগে র‌্যাবের আশকোনা ক্যাম্পে বিস্ফোরণে একজন নিহত হয়। আত্মঘাতী ওই ব্যক্তি জঙ্গি দলের সদস্য বলে ধারণা করছেন র‌্যাব কর্মকর্তারা। এ ঘটনার পর থেকেই সতর্কতা জারি করা হয়। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বার্তা প্রেরণ করা হয় দেশের সকল থানায়।
এতে পুলিশের স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা জোরদার ও সদস্যদের চলাচল করতে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। থানাগুলোতেও নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের  বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরে থানার গেটে ডিউটি করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। থানা ও ফাঁড়িতে বাইরের কেউ ঢুকতে চাইলে অধিক সতর্কতার সঙ্গে তল্লাশি করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একইভাবে পরিচয় নিশ্চিত হতে বলা হয়েছে সতর্ক বার্তায়। সারা দেশেই পুলিশকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে বলে জানান পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি শহিদুর রহমান। সতর্কবার্তা পাওয়ার পরপরই প্রতিটি থানায় জোরধার করা হয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা। গতকাল বিকালে ঢাকা মেট্রোপলিটনের কলাবাগান থানায় বাইরে সতর্ক পাহারায় ছিলেন কয়েক পুলিশ সদস্য। থানায় আগত প্রত্যেকের পরিচয় নিশ্চিত হয়েই ভেতরে প্রবেশ করতে দিচ্ছিলেন তারা। মেটাল ডিটেক্টর ব্যবহার করছিলেন পুলিশ সদস্যরা। সতর্কবার্তা সম্পর্কে জানতে চাইলে কলাবাগান থানার পরিদর্শক সমির চন্দ্র সূত্রধর জানান, ডিএমপি’র সতর্কবার্তায় নিজেদের নিরাপত্তা বজায় রেখে সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে বলা হয়েছে। একইভাবে সারা দেশের র‌্যাব সদস্যদের সতর্কবার্তা প্রেরণ করা হয়েছে। র‌্যাবের এক কর্মকর্তা জানান, ঘটনার পরপরই ক্যাম্পের আত্মঘাতী হামলার বিষয় উল্লেখ করে র‌্যাব সদর দপ্তর থেকে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে তাদের।
একইভাবে এই হামলার পরপরই জোরদার করা হয় দেশের সকল বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বিমানমন্ত্রীর জনসংযোগ কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান তুহিন সাংবাদিকদের বলেন, সব বিমানবন্দরে অধিকতর সতর্কতা জারির নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এই ঘটনার পরপরই শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তল্লাশি থেকে শুরু করে সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বিমানবন্দরের এপিবিএন’র কর্তব্যরত এএসপি তারিক জানান, ক্যানোপি এলাকায় সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তল্লাশি ছাড়া কাউকে বিমানবন্দর এলাকায় ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। যাত্রীদের ক্ষেত্রে অধিক সতর্কতার সঙ্গে চেকিং-স্ক্যানিং করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এই ঘটনার পরপর কারাগারগুলোতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক ইকবাল হাসান সাংবাদিকদের জানান, ওই ঘটনার পর কারাগারগুলোতে অধিকতর সতর্কতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সারা দেশে মোট ৬৮ কারাগারে ৭০ হাজারের বেশি বন্দি রয়েছে বলে কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এসব কারাগারে গতকাল বিকাল থেকে কারা রক্ষীরা সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। কারাগার, লঞ্চঘাট, বিমানবন্দর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্যাম্প, থানা এলাকায় বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি।
Share on Google Plus

About Nejam Kutubi

    Blogger Comment
    Facebook Comment

0 comments:

Post a Comment