দলবাজির ভারে পেশাজীবীরা

দলবাজির কাছে হারিয়ে যাচ্ছেন পেশাজীবীরা। কে কার চেয়ে বেশি দলবাজ তা প্রমাণেই এখন ব্যস্ত তারা। আইনজীবী, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, আমলা, ব্যাংকার, কবি-সাহিত্যিকসহ নানা শ্রেণী-পেশার প্রতিনিধিরা পেশার স্বার্থ রক্ষার চেয়ে দলীয় স্বার্থ রক্ষায়ই বেশি ব্যস্ত। পিছিয়ে নেই সাংবাদিকরাও। শ্রমিক সংগঠনগুলোর অবস্থাও একই রকম।
নানা সংগঠনের ব্যানারে পেশাগত স্বার্থ রক্ষার চেয়ে দলীয় রাজনীতির স্বার্থ রক্ষাকেই তারা প্রাধান্য দিচ্ছেন বেশি। দলবাজির কারণে সাংবাদিক নিহত হওয়া বা নির্যাতনের ঘটনায়ও ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ হচ্ছে না। নানান ধারায় বিভক্ত সংগঠনগুলোর সেই জৌলুস আর নেই। এসব কারণে পেশাজীবী সংগঠনের প্রকৃত উদ্দেশ্য-আদর্শই ব্যাহত হচ্ছে। রোববার যুগান্তরের সঙ্গে আলাপকালে বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধিরা বলেছেন, ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে অনেক নেতা অতিমাত্রায় দলীয় রাজনীতির প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছেন। তারা পেশাজীবীদের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে লাভের আশায় চোখ বন্ধ করে দলীয় রাজনীতির ঝাণ্ডাধারী হয়ে গেছেন। এ সুযোগে মাথাচাড়া দিয়েছে বিভেদ ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই। এ ধরনের লড়াই খুনখারাবির দিকেও নিয়ে যাচ্ছে পেশাজীবীদের। ফলে যে উদ্দেশ্য নিয়ে দেশে এক সময় পেশাজীবী সংগঠনগুলোর যাত্রা শুরু হয়েছিল, দলীয় আনুগত্যের রাজনীতিপ্রীতির কারণে হারাতে বসেছে তা। বিলীন হয়ে যাচ্ছে সংগঠনগুলোর মূল লক্ষ্য। এ প্রসঙ্গে প্রবীণ সাংবাদিক ও দৈনিক সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার রোববার যুগান্তরকে বলেন, ‘আদর্শকে বিসর্জন দেয়া যাবে না।
আদর্শকে মনে রেখেই পথ চলতে হয়। সমাজে নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ আছে, তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক আদর্শও থাকবে, চিন্তা-ভাবনা থাকবে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আদর্শের নামে পেশাজীবীদের মধ্যে অনৈক্য ও বিভেদ অনাকাক্সিক্ষত, অনভিপ্রেত।’ তিনি বলেন, ‘অনৈক্য ও বিভেদের কারণে সাংবাদিকরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তারা মার খাচ্ছে, নির্যাতিত হচ্ছে, মারা যাচ্ছে। বিভেদের কারণে সাংবাদিকদের মৌলিক যে দাবি, তাও পূরণ হচ্ছে না। এজন্য প্রয়োজন রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে পেশাগত স্বার্থ রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হওয়া। যত দ্রুত আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারব, তত বেশি নিরাপদে থাকব। ঐক্যবদ্ধ থাকলে আমাদের অধিকারও আদায় হবে। পেশাগত স্বার্থরক্ষার বিষয়টিও নিশ্চিত হবে।’ আরেক প্রবীণ সাংবাদিক ও নিউজ টুডের সম্পাদক রিয়াজউদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ‘নব্বইয়ের পর থেকেই পেশাজীবী সংগঠনগুলো ক্রমেই দুর্বল, শক্তিহীন হয়ে পড়েছে। এর মূল কারণ রাজনৈতিক বিভাজন কিংবা পেশাজীবীদের অতিমাত্রায় রাজনীতিপ্রীতি।’ তিনি বলেন, ‘এক সময় পেশাজীবী সংগঠনগুলোর যে শক্তি ছিল, যে ক্ষমতা ছিল- তা দিয়েই বাইরের আঘাত প্রতিহত করা সম্ভব হতো। রুটি-রুজির অধিকারসহ বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আদায় করা সম্ভব হতো।
কিন্তু এখন আর তা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ পেশাজীবী সংগঠনগুলোর সদস্যরা দলীয় কর্মীতে পরিণত হয়েছে। নানাভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। আর পেশাজীবীরা দলীয় কর্মীতে পরিণত হওয়ায় সংগঠনগুলোর মূল নীতি, লক্ষ্য এবং আদর্শ সাইডলাইনে চলে গেছে।’ রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, ‘আমরা এক সময় স্বাধিকার আন্দোলন করেছি একসঙ্গে। একসঙ্গে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছি। দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছি। এখন আর কেউ এক হতে পারছি না, একসঙ্গে বসতে পারছি না। দাবি আদায়ে ভিন্ন ভিন্ন প্ল্যাটফরম ব্যবহার করছি। তাও আবার যতটা না নিজেদের স্বার্থে, তার চেয়ে বেশি দলীয় স্বার্থে নিজেরা ব্যবহৃত হচ্ছি। যে কারণে পেশাজীবী সংগঠনগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। দুর্বল হয়ে পড়ছে। অন্য পেশাজীবীদের মতো সাংবাদিকরাও নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আঘাত আসছে। সাংবাদিকরা নিহত হচ্ছে, আহত হচ্ছে। প্রতিকার নেই। কারণ দলীয় কর্মীতে পরিণত হওয়ায় আমরা প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলেছি।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে না পারলে পেশাজীবীদের জন্য সামনে আরও অন্ধকার অপেক্ষা করছে।’ জানা গেছে, মূলত পেশার স্বার্থ রক্ষার জন্যই এক সময় পেশাজীবী সংগঠনগুলো গড়ে উঠেছিল। পেশার কেউ অন্যায়ের স্বীকার হলে এর প্রতিবাদ করা হতো। অথবা পেশার কেউ অন্যায় কিছু করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নজির আছে। যোগ্যতা থাকার পরও কাউকে যদি তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হতো তখন সংশ্লিষ্ট পেশার সংগঠন প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠত। রাজপথে নেমের আসার নজির আছে। পেশাজীবীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন অনেক সময় ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। সে আন্দোলন সামাল দিতে ক্ষমতাসীনদের নানা ধরনের ফন্দি-ফিকির করতে হয়েছে। কিন্তু এখন আর সেসব তেমন দেখা যায় না। বঞ্চিত সহকর্মীর পক্ষ নিয়ে কেউ প্রতিবাদ করলে একই পেশার লোক ক্ষমতাসীনদের পক্ষ নিয়ে উল্টো ভূমিকা পালন করেন। বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক রোববার যুগান্তরকে বলেন, অতিমাত্রায় দলপ্রীতি এবং দলীয় রাজনীতির প্রতি আসক্তি পুরো সমাজ ব্যবস্থাটাকেই ডুবিয়ে দিচ্ছে। কে কার চাইতে কত বেশি দলবাজ তা প্রমাণেই এখন ব্যস্ত পেশাজীবীরা। যে কারণে তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষার চাইতে দলীয় স্বার্থ রক্ষাতেই বেশি ব্যস্ত। সংশ্লিষ্টদের মতে, কাগজে-কলমে পেশাজীবী সংগঠন বলে কিছু থাকলেও বাস্তবে সংগঠনগুলো বড় দলের লেজুড়বৃত্তি করে। পেশাজীবীদের অধিকার আদায়ের পরিবর্তে এরা ব্যক্তিস্বার্থকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
অথচ দলীয় স্বার্থের কথা প্রচার করছে। কিন্তু বাস্তবে এরা দলীয় স্বার্থেও নেই। দলের ভালোর চেয়ে খারাপ হবে এমন কাজই বেশি করছে। কাজেই কোনোভাবেই এরা দলের স্বার্থ রক্ষার কথা ভাবছে এটা বলা যাবে না। এ কারণে পেশাজীবী সংগঠন বলে এখন কিছু নেই। তারা দুই বড় দলের ছাতার নিচে আশ্রয় নিয়েছে। জানতে চাইলে এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘দলীয় রাজনীতির কারণে সুশীল সমাজ বলে এখন দেশে আর কিছু নেই। এটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। পেশাজীবীরাও নানাভাগে বিভক্ত। পেশাজীবী সংগঠন বলেও কিছু নেই এখন। তারা দুই বড় দলের ছাতার নিচে আশ্রয় নিয়েছে। পেশাগত স্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে ফায়দাতন্ত্রের রাজনীতি করছেন পেশাজীবী সংগঠনগুলোর নেতারা। কে কি পাবেন, কে কি হবেন, কিভাবে নিজের আখের গোছানো যায় এসব নিয়ে তারা ব্যস্ত। অন্যায় করে কিভাবে পার পাওয়া যায়, কিভাবে মূল দলে পদ বাগানো যায়, মন্ত্রী-এমপি, চেয়ারম্যান-মেম্বার হওয়া যায়- এসবই এখন পেশাজীবী সংগঠনগুলোর নেতাদের মূল চাওয়া। এ চাওয়া পূরণের জন্য সম্মিলিত স্বার্থ বিসর্জন দিতে হচ্ছে। ন্যায়সঙ্গত অধিকার আদায় থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে।’
বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের মতে, মূল চরিত্র বিসর্জন দিয়ে পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা ব্যস্ত দলবাজিতে, নেতানেত্রীকে তুষ্ট করা নিয়ে। আইনজীবী, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, আমলা, ব্যাংকার, কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিকসহ নানা শ্রেণী-পেশার প্রতিনিধিদের অধিকাংশই এ কাজে ব্যস্ত। এক সময় শ্রমিক সংগঠনগুলো ঐক্যবদ্ধ ছিল, সাংবাদিক, আইনজীবীসহ বিভিন্ন পেশাজীবীরা ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। ঐক্যবদ্ধ থাকার কারণে কেউ পেশাজীবীদের ওপর আঘাত করতে ভয় পেত। এখন আর সেই অবস্থা নেই, পেশাজীবীরা দলীয় আনুগত্যের পরিচয় বেশি দেয়ায় নানাভাবে নিপীড়িত ও নির্যাতিত। ড. বদিউল আলম মজুমদার এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘রাজনীতি এখন আর জনসেবা নয়। এটি হচ্ছে ব্যবসা। এ ব্যবসা আবার লাভজনক। এ লাভজনক ব্যবসায় আবার ফায়দা হাসিল করা যায়। অপরাধ করে পার পাওয়া যায়। তাই রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি পেশাজীবী সংগঠনের সদস্যরাও নিজস্ব আদর্শ, উদ্দেশ্য, লক্ষ্য জলাঞ্জলি দিয়ে ফায়দাতন্ত্রে নাম লিখিয়েছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ ফায়দাতন্ত্রের সুবিধা নিতে দুই বড় দলেই ঢাউস সাইজের কমিটি হয়েছে। কিন্তু কমিটির ৭০ থেকে ৮০ ভাগ কেউ কাউকে চেনে না।
কে কিভাবে কমিটিতে জায়গা পেলেন তা জানেন না। ত্যাগী রাজনীতিকদের পরিবর্তে দলবাজ-সুবিধাবাদী- হাইব্রিডরা জায়গা করে নিয়েছেন। প্রকৃত রাজনীতিবিদরা হারিয়ে যাচ্ছেন। সংসদে, সংসদের বাইরে স্থানীয় সরকারগুলোতে রাজনীতিকদের পরিবর্তে ব্যবসায়ী-সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজ-সুবিধাভোগী-মতলববাজরা জায়গা করে নিয়েছেন।’ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমান এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, ‘পেশাজীবী সংগঠনগুলোর দলীয় আনুগত্যের কারণে সমাজ থেকে শুভবুদ্ধির মানুষের সংখ্যা হারিয়ে যাচ্ছে। সমাজে নিরপেক্ষ মানুষ, নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে ভালো কিছু চিন্তা-ভাবনা করা মানুষগুলো হারিয়ে যাচ্ছেন। দলবাজরা এতটাই প্রভাবশালী যে তাদের প্রতাপের কারণে নিরপেক্ষ অবস্থান এবং নিরপেক্ষতার বিষয়টিই হারিয়ে যাচ্ছে। এটা দেশ ও জাতির জন্য কখনোই মঙ্গল বয়ে আনবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আজকের বাংলাদেশের যে পরিস্থতি তা মূলত এ পেশাজীবী-দলবাজির রাজনীতিরই ফসল। এমনকি সর্বশেষ যে সার্চ কমিটি গঠন করা হল সেখানেও আমরা এ দলবাজির রাজনীতির প্রতিফলন লক্ষ্য করলাম।’ এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব অধ্যাপক ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, ‘কয়েক দশক থেকে পেশাজীবীদের বিশেষ করে চিকিৎসকদের ভেতর রাজনৈতিক আনুগত্য প্রকট আকার ধারণ করেছে। যা চিকিৎসা পেশায় জড়িতদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছে।
কিন্তু চিকিৎসক সমাজ এক সময় ঐক্যবদ্ধ ছিল। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এমনকি ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে চিকিৎসকদের ভূমিকা ছিল অসামান্য।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বর্তমান কমিটি এ বিভেদ ভুলে চিকিৎসক সমাজকে একতাবদ্ধ করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করব।’ ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মহাসচিব অধ্যাপক ডা. জাহিদ হোসেন এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, পেশাজীবী হিসেবে ডাক্তারদের মধ্যে রাজনৈতিক দলবাজি হচ্ছে বিষয়টি এমন নয়। সাংবাদিক, আমলা সব পর্যায়েই দলবাজি চলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে দ্বিধাবিভক্ত। এক সময় ফিলিস্তিনে বোমা হামলা হলে দলমতের ঊর্ধ্বে সবাই প্রতিবাদ করতেন। কিন্তু দেশের পরিস্থিতি এমন যে সবাই গণতন্ত্রের নামে নিজ নিজ রাজনৈতিক আদর্শের সাফাই গাইছেন। কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। তিনি আরও বলেন, ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করতে না পারলে গোষ্ঠী স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব নয়।
Share on Google Plus

About Sadia Afroza

    Blogger Comment
    Facebook Comment

0 comments:

Post a Comment