কোথায় বাংলাদেশ?

চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলায় এবং জামালপুরে একই ধরনের দুটি ঘটনা ঘটেছে। বিগত ২৯ জানুয়ারি চাঁদপুর জেলার হাইমচর উপজেলার নীলকমল ওসমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানে উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা নূর হোসেন পাটোয়ারী ছাত্রদের পিঠ দিয়ে সেতু বানিয়ে তার ওপর জুতো পায়ে হেঁটে যায়!
ওই একই দিনে জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলায় মাহমুদপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে একই ঘটনা ঘটে। ২৯ জানুয়ারি ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষক আবদুল লতিফ এবং এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায়ী অনুষ্ঠান ছিল। সেখানে বিদ্যালয়ের ছাত্রদের দিয়ে একটি মানব সেতু নির্মাণ করা হয়, যার ওপর দিয়ে হেঁটে যায় অনুষ্ঠানের অতিথি ও বিদ্যালয়ের জমিদাতা দিলদার হোসেন প্রিন্স। ওই দৃশ্য উপভোগ করার সঙ্গে সঙ্গে তাকে হেঁটে যেতে সাহায্য করে বিদ্যালয়ের শরীরচর্চা শিক্ষক হাফিজুর রহমান! এ দুই ঘটনাই ক্যামেরাবন্দি হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে (যুগান্তর, ০৩.০২.২০১৭)। এ ঘটনা জানাজানি হওয়া এবং তার বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে এবং অন্যত্র প্রতিবাদ হতে থাকার পর আওয়ামী লীগ নূর হোসেন পাটোয়ারীকে তাদের দল থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করেছে এবং কেন তাকে দল থেকে একেবারে বহিষ্কার করা হবে না তার কারণ দর্শাতে বলেছে। তার বিরুদ্ধে এবং জামালপুরের দিলদার হোসেনের বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে মামলা দায়ের করা হয়েছে। বুদ্ধিজীবীদের কয়েকজন একে অসুস্থ মানুষের কাজ, নিষ্ঠুর, অগ্রহণযোগ্য ও পশুসুলভ বলে আখ্যায়িত করেছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও এ ঘটনার তদন্তের ব্যবস্থা করেছে।
এসব থেকে মনে হতে পারে যে, এ ধরনের ঘটনার আসল চরিত্র এবং কেন এটা ঘটেছে এ বিষয়ে উপরোক্ত মহল ও ব্যক্তিদের প্রকৃত ধারণা আছে। কিন্তু বাস্তবত এর কোনো ভিত্তি নেই। এ ধরনের কোনো ভয়ংকর ঘটনার প্রতিবাদ খুব সহজ ব্যাপার। এই ‘নৈতিক’ প্রতিক্রিয়ার মধ্যে কোনো বিপদ নেই। বিপদ আছে এ ধরনের ঘটনা আজকের বাংলাদেশে কেন ঘটল তার কারণ অনুসন্ধান এবং এর প্রকৃত চরিত্র উন্মোচনের মধ্যে, যে কাজ থেকে সরকারি লোকজন ও তাদের ঘরানার বুদ্ধিজীবীরা অনেক দূরে থাকেন। তা না হলে এ দুই ঘটনার পরই সরকারের পুলিশ এই ক্রিমিনালদের গ্রেফতার করত এবং তাদের নিজেদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে যা করার করত, যেটা তারা অসংখ্য নিরীহ লোককে ধরে নিয়ে নিজেদের হেফাজতে রেখে করছে। এ দুই ক্রিমিনালই আওয়ামী লীগের সদস্য অথবা তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। সরকারি ক্ষমতায় বলীয়ান হয়েই এদের পক্ষে এ কাজ করা সম্ভব হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশে কীভাবে আইনশৃংখলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়েছে, সেটাই শুধু এই ঘটনার মধ্যে দেখা যায় না। দেখা যায় কীভাবে বাংলাদেশের সামাজিক সংস্কৃতির চরিত্র এখন গঠিত হয়েছে, কীভাবে এই সংস্কৃতি সাধারণভাবে দেশে সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সর্বনাশ ডেকে এনেছে, কীভাবে সাধারণ লোকজনের মধ্যেও পৈশাচিক প্রবৃত্তির দাপট বৃদ্ধি করছে, বুদ্ধিজীবীদের ও শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের একটা বিরাট অংশের মধ্যে ক্ষীণ প্রতিবাদ সত্ত্বেও এ ধরনের ঘটনার প্রতি সহনশীলতার জন্ম দিয়েছে।
এসব যদি না হতো তাহলে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটাই সম্ভব ছিল না। এ ক্ষেত্রে ঘটনার পর শাসক দল আওয়ামী লীগ ও সরকার ক্রিমিনালদের বিরুদ্ধে যেসব পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলছে এবং বুদ্ধিজীবীরা যে ‘নৈতিক’ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন, তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, কীভাবে এ ধরনের ঘটনা সম্ভব হল? এটা কি বাংলাদেশে ব্রিটিশ বা পাকিস্তানি আমলে সম্ভব ছিল, অথবা কোনোদিন ঘটেছিল? এ ধরনের ঘটনা কি ১৯৭২ সালের পর তিন-চার দশকের মধ্যে ইতিপূর্বে ঘটেছে? এ ধরনের ঘটনা ঘটা তো দূরের কথা, কেউ এর আগে কল্পনাও করেনি। কিন্তু এখন বিদ্যালয়ের অনুষ্ঠান উপলক্ষে ছাত্রদের শরীর দিয়ে সেতু বানিয়ে তার ওপর দিয়ে হেঁটেছে উপজেলার নির্বাচিত চেয়ারম্যান এবং অন্য বিদ্যালয়ের জমিদাতা। জমিদাতা কী উদ্দেশ্যে বিদ্যালয়ের জন্য জমি দিয়েছে তা সে-ই জানে, কিন্তু তার নিশ্চয় মনে হয়েছে জমি দান করে সে ছাত্রদের পদদলিত করার ‘অধিকার’ অর্জন করেছে। বিদ্যালয়ের জন্য জমি দান শিক্ষার উন্নতির জন্য মানুষ করে থাকে। কিন্তু এখন এ ধরনের জমিদাতা জমি দান শিক্ষার উন্নতির জন্য করেনি। এটা সে করেছে এলাকায় নিজের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার জন্য। এর থেকে সমাজবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি ও কার্যকলাপ আর কী হতে পারে? এর থেকে বোঝার কি অসুবিধা আছে সাধারণভাবে বাংলাদেশে সামাজিক সংস্কৃতি আজ কোন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে? সমাজকে পায়ের ভৃত্য বানানোর চেষ্টা ছাড়া এর মধ্যে আর কী আছে? কিন্তু এখানে আসল প্রশ্ন হল, কেন এ ধরনের ঘটনা এখন সম্ভব হল? কেন এটা ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলে এবং বাংলাদেশের প্রথম দশকগুলোতে না ঘটা এবং তা সম্ভব না হওয়া সত্ত্বেও এখন সম্ভব হল?
বলাই বাহুল্য, পার্শ্ববর্তী পশ্চিম বাংলায় এখন চুরি, দুর্নীতি, সন্ত্রাস ইত্যাদির অভাব নেই। কিন্তু সেখানেও কি এ ধরনের ঘটনা সম্ভব? সেখানে এটা ঘটলে কি সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষই অপরাধীর গায়ের চামড়া ছাড়িয়ে নেবে না? বাংলাদেশে এখন যারা ক্ষমতায় আছে তারা একেবারে ওপর থেকে নিচে পর্যন্ত ক্ষমতা মদমত্ত। অপ্রত্যাশিতভাবে ক্ষমতায় এসে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করতে করতে এরা নিজেদের দলের ও সেইসঙ্গে সমাজের ওপর থেকে নিন্ম স্তর পর্যন্ত অপরাধপ্রবণতা ছড়িয়ে দিয়েছে। রাজনীতি এখন দুর্নীতির হাতিয়ার ছাড়া এদের কাছে আর কিছু নয়। ক্ষমতা মদমত্ত হয়ে এরা দেশে এমন দুঃশাসন কায়েম করেছে, যেখানে অপরাধীরা প্রায় সব ক্ষেত্রেই ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং সেভাবে সম্পর্কিত থেকে নিজেদের মনে করছে ‘আমি কী হনু রে’! এখানে যে দুটি ঘটনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তাকে শুধু দু’জন দুর্বৃত্তের কাজ বলে নিশ্চিন্ত থাকার উপায় নেই। এর সঙ্গে সমগ্র সমাজের বর্তমান অবস্থাও বিবেচনার বিষয়। সেটা না হলে ব্রিটিশ, পাকিস্তান বা বাংলাদেশে প্রথম কয়েক দশকে যা সম্ভব ছিল না সেটা এখন সম্ভব হতো না। এটাই চিন্তা ও উদ্বেগের বিষয়। সমাজ এখন যেসব সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দুষ্কৃতিকে সহ্য করছে, এটা সমাজের সর্বনাশ কতদূর হয়েছে তার একটা ব্যারোমিটার বা মাপকাঠি। এই মাপকাঠির দিকে তাকালে দেশ ও জনগণের স্বার্থ চিন্তা যারা করেন, তাদের রাতের ঘুম হারাম হওয়ার কথা। শুধু দল থেকে একজন ঘৃণ্য অপরাধীকে বহিষ্কার করা হচ্ছে অথবা তাদের বিরুদ্ধে কেউ ব্যক্তিগতভাবে অথবা সরকারি মন্ত্রণালয় মামলা দায়ের করেছে, এটা দেখে যারা নিশ্চিন্ত হন, তাদের মধ্যে অধিকাংশই এই পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য দায়ী, অথবা এর প্রতিকারের জন্য রাজনৈতিক সংগ্রামের কোনো চিন্তাভাবনা করেন না, এমনকি তার বিরোধী। স্বাধীন বাংলাদেশ আজ দেশীয় শাসক শ্রেণীর রাজত্বে কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে, দেশের সমাজজীবনে কী ধরনের সর্বনাশ ঘটেছে, তার পরিচয় কি এর মধ্যে নেই? এর থেকে বড় সর্বনাশ একটি দেশের সমাজজীবনে আর কী হতে পারে?
০৪.০২.২০১৭
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল
Share on Google Plus

About Sadia Afroza

    Blogger Comment
    Facebook Comment

0 comments:

Post a Comment