ভাবমর্যাদা সঙ্কটে আওয়ামী লীগ

অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে গুলিতে সাংবাদিক নিহত হওয়া, মানবসেতুর ওপর দিয়ে দলের জনপ্রতিনিধিদের হেঁটে যাওয়াসহ নেতাকর্মীদের একের পর এক নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে ভাবমর্যাদা সঙ্কটে পড়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে কঠোর নির্দেশনা দেয়ার পরও তৃণমূল পর্যায়ে এ ধরনের কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই ঠেকাতে পারছে না ক্ষমতায় থাকা এ দলটি।
নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে তৃণমূলপর্যায়ে কোন্দল ততই মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। নেতাকর্মীদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষও ভালোভাবে নিচ্ছেন না। এ নিয়ে স্থানীয়পর্যায়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হচ্ছে। এটা উপলব্ধি করতে পেরে বিতর্কিত কর্মকাণ্ড এড়াতে সংশ্লিষ্ট নেতাদের ডেকে কঠোরভাবে সতর্ক করছে দলটির হাইকমান্ড। এ ছাড়া এলাকায় গিয়েও দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতারা দফায় দফায় বৈঠক করে নেতাকর্মীদের সতর্ক করে দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। সম্প্রতি চাঁদপুরের হাইমচর নীলকমল ওছমানিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠানে ছাত্রদের তৈরি মানবসেতুর ওপর দিয়ে হেঁটে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান নূর হোসেন পাটোয়ারী। এ ঘটনার ছবি ও সংবাদ বিভিন্ন গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ্য মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এতে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে দলটির হাইকমান্ড। অবশ্য ওই নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে আওয়ামী লীগ। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর পৌর আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত সভাপতি ভিপি রহিম এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পৌর মেয়র হালিমুল হক মিরুর সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ ও গোলাগুলি হয়। ওই ঘটনায় কর্তব্য পালন করতে গিয়ে স্থানীয় সাংবাদিক আবদুল হাকিম শিমুল গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। এ নিয়ে শুক্রবার এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, অন্যায় করে কেউ পার পাবে না, সে আওয়ামী লীগের যত বড় নেতাই হোক। এ ধরনের জঘন্য কাজ যারা করে, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এরা নিজেরা যেমন বিব্রতকর অবস্থায় পড়ছে একইভাবে দলকেও বিব্রতকর অবস্থায় ফেলছে। আওয়ামী লীগ এসব বিশৃঙ্খলাকারীদের বিরুদ্ধে সব সময় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এবারো ব্যত্যয় ঘটবে না।
ইতোমধ্যে সিরাজগঞ্জের দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদককে ঘটনা তদন্ত করে রিপোর্ট দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর আগে রাজধানীতে যুবলীগের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ইতোমধ্যে কয়েকজন জনপ্রতিনিধিকে ডেকে সতর্ক করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। শুক্রবার কুষ্টিয়া সদরের জিয়ারখালী ইউনিয়নে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদের এবং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আফজাল হোসেনের সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় ইদ্রিস আলী নিহত হন। ওই দিন উভয়পক্ষ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ এমপির দ্বারস্থ হলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি নেতাকর্মীদের আশ্বস্ত করেন। বুধবার রাতে খুন হন নড়াইল সদর উপজেলার ভদ্রবিলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রভাষ রায়। এক দিন পর বৃহস্পতিবার রাতে শেরপুর জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আতাউর রহমান মডেল কলেজের অধ্যক্ষ গোলাম হাসান খানকে কুপিয়ে আহত করে নিজ দলের লোকজন। এর আগে নতুন বছরে পত্রিকার শিরোনাম দখল করে আওয়ামী লীগের দলীয় এমপি লিটন হত্যাকাণ্ড। এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে হুলস্থুল পড়ে যায়। এ ঘটনায় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মাসুদকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয় পুলিশ। মাসুদ এখনো কারাগারে। গত ১২ জানুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় একটি জলমহাল দখলকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও স্থানীয় এমপি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এবং জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমানের সমর্থকদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনজন নিহত হন। এর আগের দিন রাতে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিরোধের জের ধরে বড়মাছুয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি কাইয়ুম হোসেনকে কুপিয়ে জখম করে প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীরা।
গত ১২ জানুয়ারি রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজে সিট ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এর আগে ১০ জানুয়ারি আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার বড়কান্দি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা সিরাজ সিকদার এবং সাবেক চেয়ারম্যান শফিউদ্দিনের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে হোসেন খাঁ নিহত হন। গত ৩ জানুয়ারি বান্দরবান জেলা আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক কাজী মজিবুর রহমানের বাসভবনে হামলা চালায় স্থানীয় নেতাকর্মীরা। এর আগের দিন কক্সবাজারের চকরিয়ায় ইয়াবার টাকা ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ইটের আঘাতে আহত হন এক প্রবীণ শিক্ষক। নতুন বছরের শুরুতেই গণমাধ্যমের শিরোনামে আসে খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগ। মহানগর আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক জেড এ মাহমুদকে লক্ষ্য করে প্রতিপক্ষের লোকজন গুলি করলে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে এক পথচারী নারী নিহত হন। এ ঘটনায় জেড এ মাহমুদ অভিযোগ করেন, মাদক ব্যবসার বিরোধিতা করায় তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। এর আগে ৩১ জুলাই খুলনায় ছাত্রলীগ নেতা সৈকতকে খুন করে প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীরা। গত বছরের ১৭ জুলাই একই গ্রুপের সদস্য আল আমিন ওরফে তুহিনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নতুন বছরের শুরুতেই স্থানীয় পর্যায়ে নেতাকর্মীরা অনেকটা বেপরোয়া হয়ে উঠে। শেষ দিকে কিছুটা বিরতি দিলেও এ মাসের শুরুতে আবারো শুরু হয়েছে মারামারি ও সংঘর্ষ। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের মুখপাত্র ড. হাছান মাহমুদ এমপি গতকাল শনিবার নয়া দিগন্তকে বলেন দেখুন, আওয়ামী লীগ একটি বড় দল। তৃণমূলপর্যায়ে সব সময় ছোটখাটো মতদ্বৈততা ছিল, আছে ও থাকবে।
তবে সম্প্রতি যে ঘটনাগুলো ঘটেছে তা খুবই দুঃখজনক। তিনি বলেন, দল যেহেতু টানা দুইবার ক্ষমতায় আছে সেহেতু আমাদের দলে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল প্রবেশ করেছে বলে আমরা মনে করি। ওই মহলই এসব কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে দলের ভাবমর্যাদা নষ্টের চেষ্টা করছে। ওই মহলের ব্যাপারে দল সতর্ক রয়েছে। তাদের চিহ্নিত করে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে। হাছান মাহমুদ বলেন, দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যারা এ ধরনের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত থাকবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। ইতোমধ্যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। মানবসেতুর ওপর জনপ্রতিনিধিদের হেঁটে যাওয়ার ঘটনা দুঃখজনক বলে অভিহিত করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের দেশে আইনের শাসনের অভাব রয়েছে। যেখানে অপরাধ করে অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার একটি মানসিকতা কাজ করে, সেখানে এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে। এ বিষয়টি আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। অপরাধী আওয়ামী লীগ বা অন্য দলের যে-ই হোক বিচার হওয়া উচিত।
Share on Google Plus

About Sadia Afroza

    Blogger Comment
    Facebook Comment

0 comments:

Post a Comment