রেলওয়ের লিজের জমি বন্ধক রেখে ঋণ!

রেলওয়ের লিজের জমি বন্ধক (জামানত) রেখে ১২০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক। ঋণ অনুমোদনপত্রের শর্ত অনুযায়ী উল্লেখিত ঋণের বিপরীতে জামানত রাখার কথা ২৪০ কোটি টাকা বা সমমূল্যের সম্পদ। কিন্তু ব্যাংক তা না করে রেলওয়ে থেকে লিজ হিসেবে নেয়া ১ দশমিক ১৭ একর জমি জামানত রেখেছে। ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে এ রকম গুরুতর অনিয়ম হয়েছে রাজধানীর মতিঝিলের রূপালী ব্যাংকের রূপালী সদন (ভবন) কর্পোরেট শাখায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন ও রূপালী ব্যাংকের নিজস্ব পরিদর্শন রিপোর্টে এসব অনিয়মের চিত্র বেরিয়ে আসে। কিন্তু রিপোর্ট উপস্থাপন করেই যেন সব দায়িত্ব শেষ। ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেউ। এ প্রসঙ্গে রূপালী সদন কর্পোরেট শাখার ম্যানেজার মাকসুদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, মেসার্স এইচ আর স্পিনিংকে ৯৬ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে। এসব ঋণ নিয়মিত বা স্বাভাবিক অবস্থায় রয়েছে। তবে গত ৬ বছরে কী পরিমাণ ঋণ আদায় হয়েছে এবং রেলওয়ের লিজের জমি বন্ধক রেখে ঋণ দেয়া অবৈধ বা অনিয়ম কিনা জানতে চাইলে তা তিনি পুরোপরি এড়িয়ে যান। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, এভাবে রেলের জমি জামানত নেয়া ত্রুটিপূর্ণ। মেসার্স এইচ আর স্পিনিং মিলসকে দেয়া এ ঋণে আরও অনিয়ম হয়েছে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনপত্রের শর্ত লংঘন করে কোনো কাজ না করেও এলসি খোলা হয়েছে। প্রজেক্টের লে-আউট অনুমোদন ছাড়াই পরিবর্তন করা হয়েছে। অনুমোদিত মেয়াদি ঋণ পরিশোধ না হওয়া সত্ত্বেও ঋণের সুদ ব্যাংকের আয় খাতে নেয়া হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিপুল পরিমাণের এ অর্থ ঋণ হিসেবে দিলেও শাখাটি কোনো নিয়মের তোয়াক্কা করেনি। জানতে চাইলে রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আতাউর রহমান প্রধান যুগান্তরকে বলেন, রেলওয়ের কোনো জমি লিজের মেয়াদ ৯৯ বছর হলে তা জামানত হিসেবে রাখা যায়। তবে এক্ষেত্রে রেলের জমি বন্ধক রাখার বিষয়টি ঠিক কী হয়েছে সেটা আমার জানা নেই। কারণ আমি নতুন এসেছি। অডিট আপত্তি থাকতে পারে। অডিট হলে আপত্তি আসাটা স্বাভাবিক। মূলত অডিটের মাধ্যমে অসঙ্গতিগুলো শনাক্ত করা হয়। সাধারণত বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অডিট বিভাগ এ ধরনের অডিট করে থাকে। এর বেশি কিছু তিনি বলতে রাজি হননি। তবে এসব অনিয়মের সময় রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ছিলেন এম ফরিদ উদ্দিন। বর্তমানে তিনি অবসরে। তার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে ফোন রিসিভ করেননি। ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। সূত্র জানায়, মেসার্স এইচ আর স্পিনিং মিলের অবস্থান নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হাবিবুর রহমান টিটো। ঋণ অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে হাবিবুর রহমান টিটো মুঠোফোন রিসিভ করে চুপ ছিলেন। বারবার হ্যালো বললেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। এরপর ফোন করার কারণ উল্লেখ করে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হয়। কিন্তু তাতেও তিনি সাড়া দেননি। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ফজলুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, কোনো ব্যাংকের নির্দিষ্ট কোনো ঋণ ইস্যুতে অনিয়ম হলে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
এ ধরনের ক্ষমতা দেয়া আছে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। তিনি বলেন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ব্যাংকগুলোর পলিসি প্রণয়নে কাজ করে থাকে। কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেয়ার এখতিয়ার ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নেই। জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ‘সরকারি ব্যাংকের বিষয়ে আমরা শুধু সুপারিশ করতে পারি। ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্ব অর্থ মন্ত্রণালয়ের।’ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ১২০ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণের সূত্রপাত ঘটে ২০১১ সালের ৮ মার্চ। রফতানিমুখী স্পিনিং মিল নির্মাণের জন্য মেসার্স এইচ আর স্পিনিং মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাজধানীর মতিঝিলের রূপালী সদন কর্পোরেট শাখায় প্রথমে ৯৫ কোটি ও পরে সংশোধন করে ৭৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকার মেয়াদি ঋণের আবেদন করেন। আবেদনপত্রে বলা হয়, প্রকল্পের মূল যন্ত্রপাতি চীনের সিটিএমটিসি থেকে এবং জেনারেটর ক্যাট বাংলা থেকে আমদানি করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে বছরে সুতা উৎপাদন হবে ৫ হাজার ১১ মেট্রিক টন। যার রফতানি মূল্য হবে ১৩৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট খরচ হবে ১৯৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করবেন ১১৭ কোটি টাকা। যার মধ্যে জমি কেনা ও উন্নয়ন কাজে ৪৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। এরপর রূপালী সদন কর্পোরেট শাখা এ সংক্রান্ত ঋণ প্রস্তাবটি ২০১২ সালের ২৮ মার্চ প্রধান কার্যালয়ে পাঠায়। এতে বলা হয়, প্রকল্পের কিছু জমি উঁচু এবং কিছু জমি ডোবা প্রকৃতির।
ডোবা প্রকৃতির জমিতে বালু ফেলা হয়েছে। জমিতে কোনো বাউন্ডারি ওয়াল নেই। অবকাঠামোগত উন্নয়নমূলক কোনো কাজ করা হয়নি। প্রকল্পের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগের মেয়াদ ২০০৫ ও ২০০৮ সালে উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। এ রকম একটি নেতিবাচক প্রতিবেদন পাওয়ার পরও রহস্যজনক কারণে ২০১২ সালের প্রথমদিকে রূপালী ব্যাংকের ৮৮৭তম বোর্ড সভায় ৭৬ কোটি টাকা মেয়াদি ঋণের প্রাথমিক অনুমোদন দেয়া হয়। প্রাথমিক অনুমোদনপত্রে প্রায় ২২টি শর্তসহ দীর্ঘ চিঠি চালাচালির পর ঋণ প্রস্তাবটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয় ২০১২ সালের ২৭ জুন। ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান ২০১৩ সালের ৩০ জানুয়ারি ৪৯ কোটি টাকার মেশিনারিজ আমদানির জন্য ঋণপত্র বা এলসি খোলে, যার পেমেন্ট হয় একই বছরের ৯ সেপ্টেম্বর। এতে ৭টি এলসির বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটিকে ব্যাংক দিয়েছে ৭৬ কোটি ১১ লাখ টাকা। এরপর নানা অজুহাতে প্রকল্পের মেয়াদ ও ঋণের চাহিদা বাড়তে থাকে। ২০১৪ সালে ঈদের আগে শ্রমিকদের মজুরি দেয়ার জন্য দেড় কোটি টাকা চাওয়ার বিপরীতে ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটিকে দিয়েছে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা। ২০১৪ সালের অক্টোবরে আবার ১৪ কোটি টাকা অতিরিক্ত ঋণের আবেদন করে প্রতিষ্ঠানটি। তারও কিছুদিন পর ৭৬ কোটি টাকা ছাড়াও বন্দর ডেমারেজ বাবদ ৩ কোটি ও সিভিল নির্মাণ খাতে অনুমোদন দেয়া হয় ৩ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটির অনুকূলে ৮৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা অনুমোদন ও কিছু অর্থছাড়ের পর আবারও নির্মাণ খাতে অতিরিক্ত ১০ কোটি ও যন্ত্রপাতি খাতে ৪ কোটি টাকা ঋণ মঞ্জুরের জন্য সুপারিশ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকের একটি টিম সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রতিবেদন জমা দেয় প্রধান কার্যালয়ে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, পারিশ্রমিক না পাওয়ায় শ্রমিকরা প্রকল্প ছেড়ে চলে গেছে।
প্রকল্পটির নির্মাণ কাজ বন্ধ রয়েছে। আর্থিক সমস্যার কারণে প্রকল্পটির নির্মাণ কাজ চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ইতিমধ্যে প্রকল্পে ব্যাংকের বিরাট অংকের ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। প্রকল্পটির অবশিষ্ট সিভিল কাজ শেষ না হলে ব্যাংকের ঋণ আদায় অনিশ্চিত হয়ে যাবে। এমন প্রেক্ষাপটে ২০১৫ সালের ২৫ মার্চ রূপালী ব্যাংকের ৯৬৫তম বোর্ড সভায় আরও ২০ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন দেয়া হয়। এদিকে ব্যাংকটির সর্বশেষ পরিদর্শন টিমের মূল্যায়নে বলা হয়, ঋণ অনুমোদনপত্রের শর্তানুযায়ী রেলওয়ের লিজের জমি জামানত হিসেবে দেখালে রেলওয়ের অনাপত্তিপত্র লাগবে। কিন্তু ব্যাংক তা সংগ্রহ করতে পারেনি। ৩০ শতাংশ কাজ শেষ না হলে আমদানিতে এলসি খোলা যাবে না। অথচ ১৮ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর এলসি খোলা হয়েছে। সরবরাহকারীর ক্রেডিট রিপোর্ট সংগ্রহ সাপেক্ষে এলসি খোলার নির্দেশনা থাকলেও তা পরিপালন করা হয়নি। আমদানিকৃত মেশিনারিজের মূল্যের সঠিকতা ব্যাংকের নিজস্ব উৎস থেকে যাচাই করার কোনো প্রমাণপত্র শাখায় পাওয়া যায়নি। এ রকম বহু গুরুতর অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে ব্যাংকটির পরিদর্শক দলের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে।
Share on Google Plus

About Sadia Afroza

    Blogger Comment
    Facebook Comment

0 comments:

Post a Comment