শাহজাদপুর মেয়র মিরু ঢাকায় গ্রেফতার

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে সাংবাদিক আব্দুল হাকিম শিমুল হত্যামামলায় স্থানীয় পৌরমেয়র হালিমুল হক মিরু ঢাকায় গ্রেফতার হয়েছেন। গতকাল রোববার রাতে তাকে গ্রেফতার করা হয় বলে সিরাজগঞ্জের পুলিশ সুপার মিরাজউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ঢাকার পুলিশের সহায়তায় সিরাজগঞ্জ পুলিশ শ্যামলী থেকে রাতে তাকে (মিরু) গ্রেফতার করেছে।’ ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমানও শ্যামলী থেকে মিরুকে গ্রেফতারের খবর নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, মূলত সিরাজগঞ্জের গোয়েন্দা পুলিশ গ্রেফতার করেছে,
ঢাকার গোয়েন্দা পুলিশ সহায়তা করে। আসামিকে সিরাজগঞ্জ নেয়া হচ্ছে। শাহজাদপুর পৌরসভার মেয়র মিরু সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। সাংবাদিক খুনের অভিযোগ আসার পর রোববারই তাকে বহিষ্কারের সুপারিশ করে মতাসীন দলটির উপজেলা কমিটি। শাহজাদপুরে গত বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগের দুই পরে সংঘর্ষের সময় এক প মেয়র মিরুর বাড়ি ঘেরাও করলে তিনি গুলি চালান বলে পুলিশ জানায়। এ সময় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে দৈনিক সমকালের প্রতিনিধি শিমুল গুলিবিদ্ধ হন। পরদিন শুক্রবার তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। মেয়র মিরু নিজে গুলি ছোড়ার কথা স্বীকার করেছেন। তবে তার দাবি, প্রতিপরে গুলির জবাবে তিনি এক রাউন্ড ফাঁকা গুলি করেছিলেন।
অন্যদিকে পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি, সে দিন একমাত্র মেয়র মিরুর আগ্নেয়াস্ত্র থেকেই গুলি ছোড়া হয়েছিল। সাংবাদিক শিমুলের স্ত্রী ওই ঘটনায় একটি হত্যা মামলা করেন। তাতে মেয়র মিরু, তার ভাই মিন্টুসহ ১৮ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। শাহজাদপুর সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি বিজয় মাহমুদকে মারধরের পর সে দিনের সংঘর্ষ শুরু হয়েছিল। বিজয়কে মারধরের ঘটনায় তার চাচা এরশাদ আলী বাদি হয়ে আরেকটি মামলা করেছেন। তাতেও মিরু, তার ভাই পিন্টু ও মিন্টুসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে। দুই মামলায় পুলিশ উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য কে এম নাসির উদ্দিনসহ সাতজনকে আগে গ্রেফতার করেছিল। এখন মিরুসহ আটজন গ্রেফতার হলেন। শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, ‘সাংবাদিক আবদুল হাকিম শিমুলের হত্যাকারী যে দলেরই হোক না কেন তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।’ শাহজাদপুরে পৌরমেয়র হালিমুল হক মিরুর গুলিতে নিহত সাংবাদিক আবদুল হাকিম শিমুলের নিজ বাসভবন উপজেলার মাদলা গ্রামে পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে গিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এ কথা বলেন। এ সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরো বলেন, ‘হত্যাকারী যত প্রভাবশালী হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে। পৌরমেয়র হালিমুল হক মিরু হত্যাকারী প্রমাণিত হলে দলীয় গঠনতন্ত্র ও প্রচলিত আইনানুযায়ী তাকে কঠোর শাস্তি পেতে হবে।’
তিনি সমকালের সাংবাদিক শিমুলের অসহায় পরিবারকে এক লাখ টাকা দেন এবং তার স্ত্রী নুরুন্নাহারকে তাৎক্ষণিকভাবে বগুড়ার একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চাকরি দেয়ার জন্য তাৎক্ষণিক সংশ্লিষ্ট প্রধানকে নির্দেশ দেন। এ সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সাথে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য হাসিবুর রহমান স্বপন, সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক কামরুন নাহার সিদ্দীকা, স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ দলীয় নেতারা। সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক নিহত সাংবাদিক শিমুলের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা দেন। সেই সাথে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতের দুই কোমলমতি সন্তান আল-নোমান নাজ্জাফি সাদি (১২) ও তামান্নায়ে ফাতেমার (৬) লেখাপড়ার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এ দিকে পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে পৌরমেয়র মিরুর গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে গতকাল দুপুর ১২টায় শাহজাদপুরে কর্মরত সব সাংবাদিক প্রেস কাবের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। সাংবাদিকেরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘মেয়র ও তার সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনীকে গ্রেফতারের জন্য প্রশাসনকে বেঁধে দেয়া ৪৮ ঘণ্টা সময়সীমা আজ সোমবার বেলা ১টায় শেষ হবে। এই সময়সীমার মধ্যে তাদের গ্রেফতার করা না হলে বৃহত্তর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। গতকাল রোববার বিকেলে শাহজাদপুর উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার উদ্যোগে নিহতের রূহের মাগফিরাত কামনা করে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সাংবাদিক শিমুল হত্যা মামলায় গ্রেফতার করা পাঁচ আসামিকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। গ্রেফতারকৃতরা হলেনÑ পৌর সদরের ছয়আনীপাড়া মহল্লার মৃত খন্দকার করিম বক্স ওরফে লাফা মিয়ার ছেলে কে এম নাছির উদ্দিন, বাড়াবিল গ্রামের মৃত হাজী ইসমাইল হোসেনের ছেলে মো: আলমগীর (৪২), নলুয়া মধ্যপাড়া মহল্লার মতিন খাঁর ছেলে মো: নাজমুল খাঁ (২৬), নলুয়া ভূঁইয়াপাড়ার মৃত শুকুর আলী ভূঁইয়ার ছেলে মো: আরশাদ ভূঁইয়া (৪০) ও শক্তিপুর পশ্চিমপাড়া মহল্লার মৃত কাশেম শেখের ছেলে মো: জহির শেখ (৪৫)।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা থানার এসআই কমল কুমার দেবনাথ সাংবাদিক হত্যা মামলায় গ্রেফতারকৃত সাত আসামিকে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন জানালে বিজ্ঞ আদালত ১৩ ফেব্রুয়ারি শুনানির দিন ধার্য করেন। এ ছাড়া এ দিন বিকেলে শাহজাদপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল পুলিশ পৌরমেয়রের বাসায় তল্লাশি চালিয়ে পৌরমেয়রের দু’টি পাসপোর্ট এবং তার জাতীয় পরিচয়পত্র জব্দ করেছে। অন্য দিকে সকালে শাহজাদপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ দলীয় কার্যালয়ে স্থানীয় এমপি ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি হাসিবুর রহমান স্বপনের সভাপতিত্বে এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে পৌরমেয়র হালিমুল হক মিরু ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য কে এম নাছির উদ্দিনকে দল থেকে বহিষ্কার করে তা কার্যকর করতে সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের মাধ্যমে কেন্দ্রের কাছে পাঠানো হয়েছে। এ-সংক্রান্ত একটি সিদ্ধান্ত পৌর শহরে মাইকিংয়ের মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর আজাদ রহমান বহিষ্কারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ওই জরুরি সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সাবেক এমপি ও বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য চয়ন ইসলাম, উপজেলা ও পৌর কমিটির সব নেতা। সিপিজে ও আইএফজের বিবৃতি : সাংবাদিক শিমুল হত্যাকারীদের শাস্তির আহ্বান : সাংবাদিক শিমুল নিহত হওয়ার ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে সাংবাদিকদের দু’টি আন্তর্জাতিক সংগঠন।
একই সাথে তারা এ ঘটনার যথাযথ তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করারও আহ্বান জানিয়েছে। গত শুক্রবার নিউ ইয়র্কভিত্তিক কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) এবং ব্রাসেলসভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ফর জার্নালিস্টস (আইএফজে) বিবৃতি দিয়ে সাংবাদিক শিমুল হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার করে সাজা দেয়ার আহ্বান জানায়। বিবৃতিতে সিপিজের এশিয়ার সমন্বয়ক স্টিভেন বাটলার বলেন, বহু লোকের সামনে ঘটেছে গুলির ঘটনা। পুলিশ অস্ত্রটি উদ্ধার করেছে এবং সেটির মালিককে শনাক্ত করেছে। ফলে দায়ী ব্যক্তিকে গ্রেফতারে বিলম্ব হওয়ার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। সিপিজের হিসাব অনুযায়ী ১৯৯২ সাল থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে কমপে ২০ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। পৃথক বিবৃতিতে সাংবাদিক শিমুল হত্যার নিন্দা জানায় আইএফজে। সংস্থাটির সাধারণ সম্পাদক অ্যান্থনি ব্যালেঞ্জার বলেন, আবদুল হাকিম শিমুল সেখানে কেবল তার দায়িত্ব পালন করছিলেন। এ ঘটনা মনে করিয়ে দেয় সারা বিশ্বে সাংবাদিকেরা কী পরিমাণ আত্মত্যাগ করছেন। জনগণকে তথ্য দেয়ার জন্য তারা নিজেদের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করছেন।
Share on Google Plus

About Sadia Afroza

    Blogger Comment
    Facebook Comment

0 comments:

Post a Comment