কালজয়ী দেশপ্রেমিক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান by অধ্যক্ষ ড. মোহাম্মদ সানাউল্লাহ্

একটি নাম, একটি ইতিহাস। একটি হৃদয়স্পর্শী অসাধারণ বজ্রকণ্ঠ, একটি তুলনাবিহীন নেতৃত্ব। সেই নামের সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের সৃষ্টি, এদেশের মহান স্বাধীনতা অর্জন। তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি। বাঙ্গালি জাতির জনক হিসেবে সমগ্র বিশ্বে তিনি সুপরিচিত। দেশের আপামর জনসাধারণ অন্তরের গভীর ভালোবাসায় ও ভক্তিতে তাঁকে নাম দিয়েছিল বঙ্গবন্ধু। হ্যাঁ, আমি সেই মহান মানুষটার কথাই বলছি যার  হাতের তালুতে উদিত হয়েছিল এদেশের মহান স্বাধীনতা সূর্য। তিনি বাঙ্গালি জাতির ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ডাকনাম ছিল খোকা। পিতার নাম শেখ লুৎফর রহমান এবং মাতার নাম সায়রা খাতুন। দুই ভাই ও চার বোনের মধ্যে শেখ মুজিব ছিলেন পিতা-মাতার তৃতীয় সন্তান। পারিবারিক আনন্দমুখর পরিবেশে তাঁর ছেলেবেলার দিনগুলো কাটছিল বেশ চমৎকারভাবে।
বাল্যকাল থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন একটু ভিন্নপ্রকৃতির। মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও মমত্ববোধ তখন থেকেই তাঁর আচরণে প্রকাশ পাচ্ছিল। নিজের শীতবস্ত্র শীতার্ত মানুষকে দিয়ে দেওয়া এ ধরনের একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। একবার তিনি তাঁদের গোলার ধান গ্রামের গরিব চাষীদের বিলিয়ে দিয়েছিলেন এবং বাবাকে বলেছিলেন, ‘বন্যায় এসব চাষীর ধান নষ্ট হয়ে গেছে। ওদের পেটেও তো ক্ষুধা আছে, ওরাও তো বাঁচতে চায়।’ ছেলের কথা শুনে বাবা সেদিন অনেক বেশি আনন্দিত হয়েছিলেন।
গিমাডাঙ্গা প্রাইমারি স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে শেখ মুজিব ভর্তি হলেন গোপালগঞ্জ মিশন হাইস্কুলে। উক্ত স্কুলটাতে একটি সংবর্ধনা সভা শেষে তৎকালীন জনপ্রিয় নেতা শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী চলে যাচ্ছিলেন। তখন কিশোর শেখ মুজিব তাঁদের পথ রোধ করে দাঁড়ালেন। শের-ই-বাংলা তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘আমাদের ছাত্রাবাস জরাজীর্ণ, এটার দ্রুত মেরামত প্রয়োজন, তাই টাকা লাগবে।’ শের-ই-বাংলা তাঁকে হেসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কতো টাকা লাগবে?’ শেখ মুজিব উত্তর দিলেন ‘বারো শ’। কিশোর শেখ মুজিবুর রহমানের বুদ্ধিদীপ্ত আচরণ এবং সময়োচিত সাহসিকতায় শের-ই-বাংলা বেশ খুশি হয়েছিলেন এবং তৎক্ষণাৎ প্রার্থিত টাকাটা প্রদান করেছিলেন।
গোপালগঞ্জ মিশন হাইস্কুল থেকে ১৯৪১ সালে মেট্রিক পাশ করে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হলেন শেখ মুজিবুর রহমান। সেখান থেকে ১৯৪৪ সালে আইএ এবং ১৯৪৬ সালে বিএ পাশ করেন। উক্ত কলেজে ১৯৪৬ সালে ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর আইন পড়ার জন্য তিনি ভর্তি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
ছাত্রজীবন থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ব্রিটিশ আমলের শেষ পর্যায়ে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে তিনি নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের নেতৃস্থানীয় ছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রস্থল হয় ঢাকা। পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু ছিলেন প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। ১৯৪৮ সালে গঠিত পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের তিনি ছিলেন অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশমাতৃকার টানে সেটার সাথে যুক্ত হয়ে যান এবং ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে হরতাল পালনের সময় গ্রেফতার ও কারারুদ্ধ হন। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হলে তিনি যুগ্ম সম্পাদকের পদ লাভ করেন এবং ১৯৫৩ সালে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে তিনি প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার মন্ত্রিত্ব লাভ করেন। এদেশের মানুষের অধিকার আদায় এবং শোষণ-বঞ্চনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিনি অনেকবার গ্রেফতার ও কারারুদ্ধ হন।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে পেশ করেন বাঙ্গালি জাতির ঐতিহাসিক মুক্তির সনদ ছয়দফা। এসময় তিনি বারবার নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার হতে থাকেন এবং তাঁকে প্রধান আসামী করে দায়ের করা হয় আগরতলা মামলা। শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি পূর্ব বাংলার মানুষের উচ্ছ্বসিত ভালোবাসা ও সমর্থন এবং পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠির অন্যায় ও ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে সংঘটিত হয় ১৯৬৯ এর বিশাল গণঅভ্যুত্থান যাতে করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারসহ শেখ মুজিব ও অন্যান্য নেতাকর্মীদের মুক্তি দিতে তৎকালীন পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠি বাধ্য হন এবং জেনারেল আইয়ুব খান ইয়াহিয়া খানের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে পদত্যাগ করেন। ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের অভূতপূর্ব সাফল্য এবং প্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির পর ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্র“য়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক আয়োজিত রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লক্ষ লক্ষ মানুষের এক নাগরিক সংবর্ধনায় শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
১৯৭০ সালের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে অথচ ইয়াহিয়া খানের নেতৃত্বাধীন  স্বৈরাচারী সামরিক সরকার  শুরু করে  টালবাহানা ও ষড়যন্ত্র। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে বিস্ময়ে স্তব্ধ ও হতাশ করে দিয়ে এবং গণমানুষের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদেরকে সরকার গঠনের সুযোগ না দিয়ে আকস্মিক ঘোষণার মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। এতে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভে ফেটে পড়ে পূর্ব বাংলার সর্বস্তরের মানুষ। আকস্মিক এই ঘোষণার প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৩ মার্চ অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন এবং ৭ মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে স্মরণ কালের বৃহত্তম জনসভায় ঘোষণা করেনঃ
লেখকঃ ড. মোহাম্মদ সানাউল্লাহ্
অধ্যক্ষ, মেরন সান স্কুল এন্ড কলেজ
চেয়ারম্যান, মেরিট বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন
‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ঘুমন্ত নিরস্ত্র বাঙ্গালির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং শুরু করে ইতিহাসের জঘন্য ও বর্বরতম হত্যাকাণ্ড। সেই রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। গ্রেফতারের পূর্বে অর্থাৎ ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। শুরু হয় মহান স্বাধীনতার সংগ্রাম, ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে তাঁকে রাষ্ট্রপতি করে গঠিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর প্রতিটি বাঙ্গালির হাতে পত পত করে উড়তে থাকে বাংলাদেশের বিজয়ের পতাকা।
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করে ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেন। ১২ জানুয়ারি তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ে তোলার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। কিন্তু একাত্তরের পরাজিত শত্র“রা তাঁর অভাবনীয় সাফল্য ও বাঙ্গালির অভূতপূর্ব বিজয়কে মেনে নিতে পারেনি। আবার শুরু হলো ষড়যন্ত্রের কালো খেলা। দেশ যখন সমস্ত বাধা-বিপত্তি দূর করে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন তিনি দেশীয় ষড়যন্ত্রকারী ও আন্তর্জাতিক চক্রের নির্মম শিকারে পরিণত হন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সামরিক বাহিনীর তৎকালীন কিছু উচ্চাভিলাষী ও বিপথগামী সৈনিকের হাতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন।
দ্বিধাবিভক্ত পরাধীন জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে মহান স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করার মাধ্যমে যথাযথ ও সময়োপযোগী নেতৃত্ব প্রদান নিঃসন্দেহে খুব বেশি কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ ছিল অথচ এই কাজটাই বঙ্গবন্ধু খুব সহজে সম্পন্ন করতে পেরেছিলেন। স্বাধিকার, স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার সংগ্রাম-সবগুলোই তিনি পরিচালনা করেছেন অসাধারণ মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতায়। মানুষকে উজ্জীবিত করার মতো প্রয়োজনীয় সব গুণ তাঁর ছিল। অনলবর্ষী বক্তা হিসেবে প্রচুর সুনাম ছিল তাঁর। অসাধারণ দেশপ্রেম, সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব তাঁকে বাঙ্গালি জাতির অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত করেছে। স্বাধীনতার পর খুব বেশিদিন ক্ষমতায় থাকার সুযোগ না পেলেও যতদিন ক্ষমতায় ছিলেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন তিনি। ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি ক্ষমতা লাভের পর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ভারতীয় বাহিনীর দেশত্যাগ এবং মুক্তিবাহিনীর অস্ত্র সমর্পণের ঘোষণা দেন। বিশ্বের ১০৪টি দেশ স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। বঙ্গবন্ধুর আমলেই বাংলাদেশ জাতিসংঘ, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন এবং ইসলামি সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে। ১৯৭২ সালের ১৪ ডিসেম্বর গৃহীত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান। ব্যাংক ও বিমাসহ শিল্পকারখানাসমূহ জাতীয়করণ করা হয়। ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম বাংলায় বক্তৃতা করেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। টুঙ্গিপাড়ার খোকা। এক অসাধারণ দেশপ্রেমিকের নাম। তাঁরই নেতৃত্বে অর্জিত হয়েছিল বাঙ্গালির হাজার বছরের প্রতীক্ষিত ও প্রত্যাশিত স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা বাঙ্গালি জাতির জীবনে সূচিত করেছে গতি ও প্রগতির এক নতুন অধ্যায়। আত্মপরিচয়হীন জাতি নতুন করে খুঁজে পেয়েছে তার অস্তিত্ব ও আত্মমর্যাদা। বঙ্গবন্ধু নিজের স্বার্থকে কখনো অগ্রাধিকার দেন নি, জাতির কল্যাণ ও মঙ্গলের কথাই তিনি সবসময় ভেবেছেন। জেল, জুলুম ও নির্যাতনের কাছে তিনি কখনো নতি স্বীকার করেন নি। তাঁর মহান আত্মত্যাগ জাতিকে উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। তিনি কোন গোত্র, গোষ্ঠি কিংবা দলের নন, তিনি সমগ্র দেশের ও সকল মানুষের। ‘বাংলাদেশ’ ও ‘স্বাধীনতা’ এদুটো শব্দ যতোদিন থাকবে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম ততোদিন সমগ্র বিশ্বে সসম্মানে ও সদর্পে উচ্চারিত হতে থাকবে।
লেখকঃ ড. মোহাম্মদ সানাউল্লাহ্
অধ্যক্ষ, মেরন সান স্কুল এন্ড কলেজ,
চেয়ারম্যান, মেরিট বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন
Share on Google Plus

About Unknown

    Blogger Comment
    Facebook Comment

0 comments:

Post a Comment